শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ , ০১:৫৮ পিএম
মানুষ একদিন না একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু মৃত্যুর পর কী থেকে যায়? অর্থ, সম্পদ, নাকি মানুষের মনে গেঁথে থাকা কিছু স্মৃতি? গবেষকরা বলছেন, মানুষ আসলে জীবনের শেষ নয়, বরং মৃত্যুর পর কী রেখে যাবে—সেই ভাবনাই তার জীবনে অর্থ, প্রেরণা এবং মানসিক শান্তি এনে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর বোলিং গ্রিন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেথ হান্টার দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাধিকার বা জীবনের রেখে যাওয়া প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, মানুষ চাইলেও বা না চাইলেও সবারই একটি উত্তরাধিকার থেকে যায়।
গবেষকদের ভাষায়, একজন মানুষের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার সাধারণত তিন ধরনের হতে পারে। প্রথমটি হলো জৈবিক উত্তরাধিকার, অর্থাৎ সন্তান বা নিজের শরীরের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কিছু পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়টি বস্তুগত উত্তরাধিকার, যেমন সম্পদ, অর্থ কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র। আর তৃতীয়টি হলো মূল্যবোধের উত্তরাধিকার, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকরা।
কেন মানুষ উত্তরাধিকার রেখে যেতে চায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুভয় মানুষের অন্যতম বড় অনুভূতি। অনেকেই মনে করেন, মৃত্যুর পরও যেন তাদের অস্তিত্ব কোনো না কোনোভাবে থেকে যায়। সেই কারণেই মানুষ চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাকে মনে রাখুক।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম্বারলি ওয়েড-বেনজোনি বলেন, মৃত্যুর কথা ভাবলে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজতে শুরু করে। আর তখনই নিজের রেখে যাওয়া প্রভাব বা উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবনা তৈরি হয়।
শুধু সম্পদ নয়, মানুষ রেখে যেতে চায় মূল্যবোধ
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুর পর অর্থ বা সম্পদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তাদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও জীবনদর্শনকে।
অনেকেই চান, তাদের সন্তান বা পরিবার তাদের কাছ থেকে দয়া, সহমর্মিতা, অন্যের উপকার করার মানসিকতা কিংবা পারিবারিক ঐতিহ্য গ্রহণ করুক। কেউ নিজের জীবনের গল্প লিখে যান, কেউ ডায়েরি রেখে যান, আবার কেউ নিজের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী
গবেষকদের দাবি, নিজের জীবনের উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যতের জন্য কী রেখে যেতে চান, তা নিয়ে ভাবলে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়। এতে উদ্বেগ ও হতাশা কমতে পারে।
বিশেষ করে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের ক্ষেত্রে চিঠি লেখা, স্মৃতিচারণ, পারিবারিক গল্প সংরক্ষণ বা নিজের মূল্যবোধ লিখে রাখার মতো কাজ তাদের মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং জীবনের শেষ সময়টুকু অর্থবহ করে তোলে।
অল্প বয়সেই শুরু হতে পারে এই ভাবনা
অনেকেই মনে করেন, উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবার বিষয়টি শুধু বৃদ্ধ বয়সের জন্য। তবে গবেষকরা বলছেন, এই ভাবনা জীবনের যেকোনো সময় থেকেই শুরু করা যায়।
যারা ছোটবেলা থেকেই ভাবেন ভবিষ্যতে সমাজ, পরিবার বা পৃথিবীর জন্য কী রেখে যেতে চান, তারা সাধারণত অন্যের কল্যাণে বেশি কাজ করেন, সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন এবং জীবনে বেশি অর্থ খুঁজে পান।
কীভাবে তৈরি করবেন নিজের উত্তরাধিকার?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিজের জীবনের লক্ষ্য, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যেতে চান, তা লিখে রাখা যেতে পারে। ভালো কাজ করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করা—এসবই হতে পারে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
মৃত্যুর পর মানুষ আপনাকে কত সম্পদের মালিক ছিলেন, তা হয়তো খুব বেশি মনে রাখবে না। কিন্তু আপনি কেমন মানুষ ছিলেন, কাদের জীবনে আলো ছড়িয়েছেন এবং কী মূল্যবোধ রেখে গেছেন—সেটাই হয়ে উঠতে পারে আপনার প্রকৃত পরিচয়। গবেষকরা বলছেন, উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবনা শুধু মৃত্যুর পরের বিষয় নয়; বরং এটি জীবিত অবস্থায় আরও অর্থবহ জীবন গড়ার একটি শক্তিশালী পথ।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ