মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ , ১১:১৪ এএম
বর্ষা এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় নদীভাঙন। এক রাতের মধ্যেই নদীগর্ভে হারিয়ে যায় বসতবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তা, স্কুল, বাজার—কখনও কখনও পুরো একটি গ্রাম। প্রতিবছর হাজারো পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নদীভাঙন কেন হয়? শুধু কি বর্ষার বৃষ্টিই এর জন্য দায়ী, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কারণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে এখন অনেক এলাকায় নদীভাঙন আগের তুলনায় আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
নদীভাঙন কী?
নদীর প্রবল স্রোত বা পানির চাপে নদীর পাড় ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়াকে নদীভাঙন বলা হয়। এতে নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হতে পারে। একদিকে ভাঙন সৃষ্টি হলেও অন্যদিকে পলি জমে নতুন চর বা ভূমির সৃষ্টি হয়।
বর্ষায় কেন বাড়ে নদীভাঙন?
বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল, ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানির কারণে নদীতে স্রোতের গতি বেড়ে যায়। তখন নদীর বাঁক বা দুর্বল পাড়ে পানির চাপ বেশি পড়ে। ফলে মাটি ধসে নদীগর্ভে চলে যায়।
বিশেষ করে বড় নদীগুলোর তীরবর্তী এলাকায় এই সময় ভাঙনের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
নদীর স্রোত কীভাবে পাড় ভাঙে?
নদী কখনও সোজা পথে প্রবাহিত হয় না। বিভিন্ন জায়গায় বাঁক তৈরি হয়। বাঁকের বাইরের অংশে স্রোতের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই চাপের কারণে পাড়ের মাটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। একসময় বড় অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যায়।
মাটির ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
সব ধরনের মাটি সমান শক্ত নয়। বালুমিশ্রিত বা আলগা মাটি খুব সহজেই পানির চাপে ভেঙে যায়। অন্যদিকে শক্ত কাদামাটি তুলনামূলক বেশি সময় টিকে থাকে।
বাংলাদেশের অনেক নদীতীর নরম পলিমাটি দিয়ে গঠিত হওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকি বেশি।
মানুষের কর্মকাণ্ডেও বাড়ছে ভাঙন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন, নদীর তীর দখল, প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে নদীভাঙনকে আরও তীব্র করে তোলে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলের ঘটনা বেড়েছে। এতে নদীতে পানির প্রবাহ ও স্রোতের তীব্রতা বাড়ে। ফলে নদীভাঙনের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
নদীভাঙনের প্রভাব
নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার বাড়িঘর হারায়। ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা। অনেক মানুষ জীবিকা হারিয়ে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি হয়।
কীভাবে কমানো সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নিয়মিত নদী খনন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই তীররক্ষা ব্যবস্থা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা এবং আগাম সতর্কতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রকৃতির নিয়ম, তবে সচেতনতা জরুরি
নদীভাঙন প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এর প্রভাব কমাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীকে তার স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হতে দেওয়া, পরিবেশ রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনাই হতে পারে নদীভাঙনের ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ।
আরটিভি/জেএমএ