শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬ , ১০:২৯ পিএম
মানুষের জীবনে সুগন্ধ শুধু সৌন্দর্য বা বিলাসিতার অনুষঙ্গ নয়। বরং চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার হাজার বছরের পুরোনো। ভারতীয় মহাকাব্য, গ্রিক পুরাণ, প্রাচীন মিশর, চীন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপ যুগে যুগে ভেষজ ও সুগন্ধি উপাদান ব্যবহার করে রোগ উপশমের নানা নজির পাওয়া যায়। আধুনিক চিকিৎসা জগতে এই পদ্ধতি পরিচিত অ্যারোমাথেরাপি নামে।

ইতিহাসে সুগন্ধি চিকিৎসার উল্লেখ
রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডে বর্ণিত আছে, ইন্দ্রজিতের শক্তিশেলের আঘাতে অচেতন হয়ে পড়া লক্ষ্মণকে সুস্থ করতে বৈদ্য সুষেণ গন্ধমাদন পর্বতের চারটি ভেষজ- মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সন্ধানকরণী ও সবর্ণকরণী সংগ্রহের পরামর্শ দেন। হনুমান পুরো পর্বতই বহন করে আনেন। কাহিনিতে বলা হয়, ওই ভেষজের তীব্র গন্ধেই লক্ষ্মণের জ্ঞান ফিরে আসে।

ঋগ্বেদ, চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা এবং মহাভারতের বিরাট পর্বেও বিভিন্ন সুগন্ধি ভেষজ ও তেলের ব্যবহার উল্লেখ রয়েছে। দ্রৌপদী রানি সুদেষ্ণার জন্য সুগন্ধি তেল ও প্রসাধনী তৈরির দক্ষতার কথাও বলেছিলেন। প্রাচীন ভারতে এই বিদ্যাকে বলা হতো ‘গন্ধযুক্তি’।

আধুনিক অ্যারোমাথেরাপির সূচনা
১৯৩৭ সালে ফরাসি রসায়নবিদ রেনে-মরিস গাতেফোসে গবেষণাগারে দুর্ঘটনায় হাতে গুরুতর দগ্ধ হওয়ার পর ভুলবশত ল্যাভেন্ডার তেল ব্যবহার করেন। পরে তিনি দাবি করেন, এতে দ্রুত ক্ষত শুকিয়ে যায় ও ব্যথা কমে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি "অ্যারোমাথেরাপি" শব্দটির প্রচলন করেন।
পরবর্তীতে ফরাসি সার্জন জ্যঁ ভালনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আহত সৈন্যদের চিকিৎসায় এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে চিকিৎসা, রূপচর্চা ও ওয়েলনেস শিল্পে অ্যারোমাথেরাপির বিস্তার ঘটে।

বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতায় ব্যবহার
প্রাচীন মিশরে মৃতদেহ সংরক্ষণ, সৌন্দর্যচর্চা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সুগন্ধি ভেষজ ও তেল ব্যবহৃত হতো। ইতিহাসে মিশরের রানি ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যচর্চায় সুগন্ধি উপাদানের ব্যবহারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
চীনেও কয়েক হাজার বছর আগে ধর্মীয় আচার, স্বাস্থ্য রক্ষা ও সৌন্দর্যচর্চায় সুগন্ধি ভেষজ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। আধুনিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় স্পা, ওয়েলনেস সেন্টার এবং পরিপূরক চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অ্যারোমাথেরাপি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কীভাবে কাজ করে অ্যারোমাথেরাপি?
অ্যারোমাথেরাপিতে মূলত বিভিন্ন ফুল, পাতা, গাছের ছাল ও শিকড় থেকে পাতন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করা হয়।

এই তেল ব্যবহারের প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো-
ঘ্রাণের মাধ্যমে (ইনহেলেশন)
ত্বকে মালিশ (ম্যাসাজ থেরাপি)
অ্যারোমা বাথ
প্রসাধনীতে ব্যবহার (কসমেটিক থেরাপি)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুগন্ধি অণু নাকের ওলফ্যাক্টরি রিসেপ্টরের মাধ্যমে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে, যা আবেগ, স্মৃতি ও মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। এজন্য ল্যাভেন্ডার তেল শিথিলতা এনে দিতে এবং লেবুর সুগন্ধ ক্লান্তি কমাতে সহায়ক বলে অনেকে মনে করেন।
কোন কোন তেল বেশি ব্যবহৃত হয়?
অ্যারোমাথেরাপিতে বহুল ব্যবহৃত এসেনশিয়াল অয়েলের মধ্যে রয়েছে- ল্যাভেন্ডার, টি ট্রি অয়েল, রোজমেরি, পেপারমিন্ট,ইউক্যালিপটাস,রোজ অয়েল ও চন্দন তেল।

এসব তেল অত্যন্ত ঘন হওয়ায় সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করা হয় না। সাধারণত নারকেল, অলিভ বা আমন্ড অয়েলের মতো ক্যারিয়ার অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়।
কী কী উপকারের দাবি করা হয়?
অ্যারোমাথেরাপি সমর্থকদের দাবি, এটি-
মানসিক চাপ কমাতে, ঘুমের সমস্যা উপশমে,পেশির ক্লান্তি দূর করতে, মাইগ্রেনের অস্বস্তি কমাতে, স্পা ও রূপচর্চায়, ত্বক ও চুলের পরিচর্যায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক
তবে অ্যারোমাথেরাপির চিকিৎসাগত কার্যকারিতা নিয়ে এখনো বৈজ্ঞানিক মহলে মতভেদ রয়েছে। ভারতের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ কৌশিক লাহিড়ী বলেন, অ্যারোমাথেরাপির মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তার মতে, সুগন্ধ মানুষের মন ভালো করতে বা আরাম দিতে সহায়ক হতে পারে, তবে এটিকে কোনো রোগের বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অ্যারোমাথেরাপি প্রয়োগের আগে অবশ্যই প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই এটি প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং প্রয়োজন হলে সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আরটিভি/এসকে