শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬ , ০৯:৩৪ পিএম
সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবনে মানসিক সংযোগের পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এই শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক যে কতটা গভীর, তা অনেকেই জানেন না। কিছু খাবার শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে, মেজাজ ভালো রাখতে এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। আবার কিছু খাবার হজমে সমস্যা, পেট ফাঁপা, ক্লান্তি বা দুর্গন্ধের মতো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের আনন্দ মাটি করে দিতে পারে। তাই সঙ্গীর সঙ্গে বিশেষ সময় কাটানোর আগে কোন খাবারগুলো আপনার পাতে রাখা উচিত, আর কোনগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো— তা জেনে রাখা জরুরি।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, অন্তরঙ্গ মুহূর্তকে আরও উপভোগ্য করে তুলতে কোন খাবারগুলো হতে পারে আপনার বন্ধু, আর কোনগুলো শত্রু ।
যেসব খাবার খাবেন
বেদানা বা ডালিম
ইতিহাসজুড়ে এই ফলটি উর্বরতার প্রতীক এবং যৌন শক্তি বর্ধক হিসেবে পরিচিত। বর্তমানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই লোককথাগুলোর পেছনে বেশ কিছু সত্যতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত বেদানার রস বা জুস খেলে তা আপনার মেজাজ ফুরফুরে রাখতে, রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে এবং টেস্টোস্টেরনের মাত্রা উন্নত করতে সাহায্য করে। আর এই সবগুলো বিষয়ই আপনার দাম্পত্য জীবনকে আরও রোমান্টিক ও আনন্দময় করে তুলতে পারে।

চকলেট
রোমান্সের সাথে চকলেটের নাম জড়িয়ে থাকার পেছনে সত্যিই চমৎকার কারণ রয়েছে। মিষ্টি এই খাবারটি শরীরে ‘সেরোটোনিন’ নামক হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা আমাদের মনে সুখ ও ভালো থাকার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। চকলেট খাওয়ার ফলে মেজাজ যেভাবে ফুরফুরে হয়ে ওঠে, তা যৌন আকাঙ্ক্ষাও বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়াও এই সুস্বাদু খাবারে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে 'ফিনাইলইথাইলামিন'— মস্তিষ্কের এমন এক রাসায়নিক উপাদান যা প্রেম-ভালোবাসা এবং আকর্ষণের অনুভূতির সাথে সরাসরি জড়িত।
_20260704_212300807.webp)
পালং শাক
এই শাকটিকে সাধারণত খুব একটা আকর্ষণীয় বা রোমান্টিক খাবার ভাবা হয় না। কিন্তু এটি আপনার যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নানাদিক থেকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। এই সবুজ শাকটিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম, যেটি এমন এক খনিজ উপাদান যা টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে আরও রয়েছে আয়রন, যা বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে যৌন ইচ্ছা ও তৃপ্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
তরমুজ
রসালো এই ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে 'সিট্রুলাইন' নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। আমাদের শরীর এই উপাদানটিকে 'আর্জিনিন' নামক অন্য একটি অ্যামিনো অ্যাসিডে রূপান্তর করে, যা রক্তনালীগুলোকে শিথিল বা প্রসারিত করতে সাহায্য করে। এর ফলে জননাঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বা পাম্পিং বৃদ্ধি পায়; ঠিক যেভাবে ভায়াগ্রা কাজ করে থাকে।
অ্যাভোকাডো
নরম ও মাখনের মতো এই সবুজ ফলটি হার্ট বা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী ফ্যাট এবং ফাইবারে ভরপুর, যা আপনাকে দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগাতে সাহায্য করবে। অ্যাভোকাডোতে রয়েছে ভিটামিন বি৬। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভিটামিনটি নারীদের পিএমএস (PMS বা পিরিয়ড-পূর্ববর্তী লক্ষণ) এর বিভিন্ন সমস্যা যেমন— ক্লান্তি, পেট ফাঁপা এবং খিটখিটে মেজাজ দূর করতে সাহায্য করে। আর এই অস্বস্তিগুলো দূর হলে নারীদের মন রোমান্টিক মুডে আসাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
কফি বা চা
এই পানীয়গুলো শরীরে ক্যাফেইনের জোগান দেয়, যা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে চাঙ্গা ও সতেজ করে তোলে। এটি পুরুষদের বেশি সাহায্য করতে পারে। এছাড়া কফি এবং চায়ে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা আপনাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগমুহূর্তে এটি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটি আপনার রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

চর্বিযুক্ত মাছ
স্যামন, সারডিন এবং ম্যাকরেলের মতো মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। এই স্বাস্থ্যকর ফ্যাটগুলো শরীরের ভেতরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমাতে সাহায্য করে, যা আপনার যৌন স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে। আপনি যদি সামুদ্রিক খাবার বা মাছ খেতে পছন্দ না করেন, তবে তিসির বীজ, চিয়া সিড এবং আখরোট থেকেও ওমেগা-৩ পেতে পারেন।
ঝিনুক
এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে জিঙ্ক থাকে, যা শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। এই হরমোনটি মানুষের মেজাজ এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।
জিঙ্ক পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা বাড়াতে এবং সেগুলোর কার্যকারিতা বা গতিশীলতা উন্নত করতেও সাহায্য করতে পারে। ঝিনুক বা সামুদ্রিক খাবার পছন্দ নয়? কোনো সমস্যা নেই! জিঙ্ক সমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার বেছে নিতে পারেন; যেমন— ফোর্টিফাইড সিরিয়াল (ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ শস্যদানা), কুমড়োর বীজ, কাজুবাদাম এবং দই।
এড়িয়ে চলবেন যেসব খাবার:
অ্যালকোহল
অ্যালকোহল আপনার যৌন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, অ্যালকোহল শরীরের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে ফেলে, যা রক্ত সঞ্চালন ও স্নায়ুর সংবেদনশীলতাকে ব্যাহত করে। এর ফলে যৌন উদ্দীপনা বা আসা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়; যা থেকে ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং নারীদের ক্ষেত্রে যোনিপথের শুষ্কতা তৈরি হতে পারে।

স্যাচুরেটেড ফ্যাট
চর্বিযুক্ত গরুর মাংস এবং মাখনের মতো যেসব খাবারে উচ্চ মাত্রায় স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, সেগুলো সময়ের সাথে সাথে আপনার রক্ত সঞ্চালনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে জননাঙ্গে রক্ত প্রবাহ ধীর হয়ে যেতে পারে। এছাড়া স্বল্প মেয়াদে বা তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে, অতিরিক্ত মাংসযুক্ত ডায়েট আপনার আকর্ষণ কমিয়ে দিতে পারে; কারণ মাংস খাওয়ার ফলে শরীরে এক ধরণের অপ্রীতিকর বা দুর্গন্ধযুক্ত ঘাম তৈরি হতে পারে।
লিগিউমস বা শিম ও ডাল জাতীয় শস্য
টাফটস মেডিকেল সেন্টারের নিবন্ধিত ক্লিনিকাল ডায়েটিশিয়ান কেইটলিন ড্রেসার বলেন, শিম, ডাল, ছোলা এবং এই জাতীয় অন্যান্য শস্যগুলো পরিপাকতন্ত্রে অস্বস্তি বা সমস্যা তৈরির জন্য বেশ পরিচিত। এর কারণ হলো, এগুলোতে এমন কিছু ফাইবার এবং শর্করা থাকে যা মানবদেহ স্বাভাবিক উপায়ে হজম করতে পারে না। ফলস্বরূপ, আমাদের অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া এগুলোকে ভেঙে ফেলে এবং ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়া শুরু করে।
ক্রুসিফেরাস সবজি
ব্রকলি, বাঁধাকপির মতো ক্রুসিফেরাস গোত্রের সবজিগুলো আমাদের খাওয়া সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম। নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ইরভিং মেডিকেল সেন্টারের পরিপাকতন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র ক্লিনিকাল নিউট্রিশনিস্ট সাবরিনা অলিভার ব্যাখ্যা করেন, ‘‘এসব সবজি পেটে গ্যাস তৈরি করার আশঙ্কাও অনেক বেশি থাকে।’’ প্রচুর পরিমাণে ফাইবারের পাশাপাশি এই সুপারফুডগুলোতে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ‘গ্লুকোসিনোলেটস’—যা এক ধরণের প্রাকৃতিক সালফারযুক্ত যৌগ এবং হজম হওয়ার সময় এটি সালফারের মতো দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস তৈরি করতে পারে।
রসুন এবং পেঁয়াজ
রসুন এবং পেঁয়াজ—উভয় খাবারেই সালফারযুক্ত যৌগ বা উপাদান থাকে। নিউট্রিশনিস্ট অলিভার বলেন, “আপনি যখন এগুলো চিবিয়ে খান, তখন এই সালফার যৌগগুলো থেকে এক ধরণের গ্যাস নির্গত হয়, যা আপনার মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়ার সাথে মিশে যায়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলোও নিজস্ব গ্যাস তৈরি করে, যার ফলে মুখে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়।”
দুর্ভাগ্যবশত, এই গন্ধটা দীর্ঘসময় ধরে থেকে যেতে পারে। এ বিষয়ে ড্রেসার বলেন, “হজম প্রক্রিয়া চলার সাথে সাথে এই খাবারগুলোর উপজাত বা বাইপ্রোডাক্টগুলো রক্তপ্রবাহে শোষিত হয় এবং সেখান থেকে ফুসফুসে পৌঁছায়, যা পরবর্তীতে আমাদের নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে।”
ভারী কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা
ভাত, পাউরুটি, পাস্তা এবং আলুর মতো খাবারগুলোতে যে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা থাকে, তাতে রয়েছে 'সিম্পল সুগার' বা সরল শর্করা; যা খাওয়ার সাথে সাথে আপনার শরীরে তাৎক্ষণিকভাবে শক্তির জোগান দেয়। তবে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই শক্তির জোয়ার খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না— এই ধরণের সিম্পল কার্বসগুলো রক্তে শক্তির মাত্রা হুট করে বাড়িয়ে দেওয়ার পরপরই আবার দ্রুত কমিয়ে দেয়, যার ফলে আমরা চরম ক্লান্তিবোধ করি।
লাল মাংস
ডেটের রাতে আপনাকে যে গরুর মাংস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে—এমনটি নয়; তবে কিছু ধরণের লাল মাংস আপনাকে রোমান্টিক মুডে রাখার চেয়ে সোফায় অলসভাবে শুয়ে পড়তে বাধ্য করার সম্ভাবনা বেশি। এর কারণ হলো, ফ্যাট বা চর্বি আমাদের শরীরের জন্য হজম করা সবচেয়ে কঠিন পুষ্টি উপাদান। এই হজম প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে শরীর আমাদের বেশিরভাগ শক্তিকে পরিপাকতন্ত্রের দিকে চালিত করে—আর অতিরিক্ত চর্বি পরিপাকে গোলমাল বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই চর্বিমুক্ত বা কম চর্বিযুক্ত মাংসের টুকরো বেছে নিন এবং বেশি চর্বিযুক্ত মাংস এড়িয়ে চলুন।

দুগ্ধজাত খাবার
যুক্তরাষ্ট্রের 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস'-এর তথ্য অনুযায়ী ৩৬% আমেরিকান ল্যাকটোজ ইনটলারেন্ট (যাদের দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার হজমে সমস্যা হয়)। বাংলাদেশেও এই সমস্যা বহু মানুষের আছে। তবে আপনি যদি তাদের মধ্যে নাও পড়েন, তবুও দুগ্ধজাত খাবার আপনার আইবিএস (IBS বা ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম)-এর লক্ষণগুলোকে বাড়িয়ে দিতে পারে অথবা বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা তৈরি করতে পারে। এছাড়া দুগ্ধজাত খাবারগুলোতে সাধারণত চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে— আর এই কারণেই শরীর যখন এটি হজম করার জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করে, তখন আপনি অলস বা ক্লান্তিবোধ করতে পারেন।
ভাজাপোড়া
নিউট্রিশনিস্ট অলিভার বলেন, “ভাজাপোড়া এবং তৈলাক্ত খাবার মানুষের পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি ডায়রিয়াও বাঁধিয়ে দিতে পারে। তাই এই ধরণের খাবার এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো এবং এর বদলে বেকড বা গ্রিলড খাবার অর্ডার করা উচিত।” এছাড়া তিনি আরও জানান, একবারে বেশি পরিমাণে খেলে পেট ফাঁপার অনুভূতি হতে পারে; তাই খাবার সবসময় ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া উচিত এবং পেট ভরে গেলেই খাওয়া থামানো প্রয়োজন।
আরটিভি/এমএস