শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ১০:৪৬ এএম
শরীরে কোনো রোগ লুকিয়ে আছে কি না, তা আগেভাগেই জানতে অনেকেই এখন পুরো শরীরের এমআরআই (MRI) করানোর কথা ভাবছেন। বিশেষ করে ক্যানসার, টিউমার বা অন্য কোনো গুরুতর রোগ দ্রুত শনাক্ত করার আশায় এই পরীক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সুস্থ মানুষের জন্য নিয়মিত পুরো শরীরের এমআরআই করানো কি সত্যিই প্রয়োজন? নাকি এতে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ ও অতিরিক্ত পরীক্ষার ঝুঁকিও রয়েছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমআরআই রোগ নির্ণয়ের অন্যতম আধুনিক, নিরাপদ ও নির্ভুল পরীক্ষাপদ্ধতি। তবে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত পুরো শরীরের এমআরআই করানোর পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
এমআরআই কী?
এমআরআই বা ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং এমন একটি পরীক্ষাপদ্ধতি, যেখানে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ও রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অত্যন্ত স্পষ্ট ছবি তৈরি করা হয়। এই পরীক্ষায় ক্ষতিকর বিকিরণ ব্যবহার করা হয় না। তাই এটি নিরাপদ ও ব্যথাহীন একটি পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত।
শরীরের নরম টিস্যু, পেশি, স্নায়ু, মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, হৃদ্যন্ত্র, লিভার, কিডনি, রক্তনালি ও অন্যান্য অঙ্গের সূক্ষ্ম পরিবর্তনও এই পরীক্ষায় সহজেই ধরা পড়ে।

কোন কোন রোগ শনাক্তে কার্যকর?
চিকিৎসকদের মতে, এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—
পুরো শরীরের এমআরআই কেন করানো হয়?
পুরো শরীরের এমআরআই মূলত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে কোনো অস্বাভাবিকতা, টিউমার বা গুরুতর রোগের প্রাথমিক লক্ষণ আছে কি না, তা খুঁজে বের করার জন্য করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই শরীরের ভেতরের পরিবর্তন এই পরীক্ষায় ধরা পড়তে পারে। তাই কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুস্থ মানুষের জন্য নিয়মিত পরীক্ষা কতটা প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের কোনো উপসর্গ নেই এবং গুরুতর রোগের পারিবারিক ইতিহাসও নেই, তাদের নিয়মিত পুরো শরীরের এমআরআই করানোর প্রয়োজনীয়তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
কারণ এই পরীক্ষায় অনেক সময় এমন কিছু পরিবর্তন ধরা পড়ে, যা বাস্তবে ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এসব দেখে রোগী অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসা কিংবা মানসিক উদ্বেগে ভুগতে পারেন।
তাই শুধু নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য নয়, বরং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে পুরো শরীরের এমআরআই করানোই সবচেয়ে যৌক্তিক।
পরীক্ষাটি কীভাবে করা হয়?
পরীক্ষার সময় রোগীকে একটি চলমান টেবিলে শুইয়ে এমআরআই যন্ত্রের ভেতরে নেওয়া হয়। পুরো সময় রোগীকে একেবারে স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে হয়। সামান্য নড়াচড়াও ছবির মান নষ্ট করতে পারে।
পরীক্ষার সময় যন্ত্র থেকে কিছু শব্দ শোনা যায়, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কেউ যদি স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে না পারেন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে হালকা ঘুমের ওষুধ দেওয়া হতে পারে।
সাধারণত পরীক্ষা শেষ হতে ১০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ঘণ্টাও লাগতে পারে।
নিরাপদ হলেও কিছু সতর্কতা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমআরআই পরীক্ষায় ক্ষতিকর বিকিরণ নেই। তাই এটি শরীরের টিস্যুর ক্ষতি করে না এবং সাধারণভাবে নিরাপদ।
তবে যেহেতু এতে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করা হয়, তাই পরীক্ষার আগে শরীরে বা সঙ্গে থাকা সব ধরনের ধাতব বস্তু খুলে ফেলতে হয়।
যাদের শরীরে কৃত্রিম হৃদ্যন্ত্রের ভালভ, ধাতব রড, কিছু ধরনের কৃত্রিম যন্ত্র বা ধাতব ইমপ্লান্ট রয়েছে, তাদের অবশ্যই আগে চিকিৎসককে জানাতে হবে।
কারা সাময়িকভাবে এড়িয়ে চলবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে পুরো শরীরের এমআরআই কিছুদিনের জন্য এড়িয়ে চলা ভালো।
তবে এসব ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
খরচ কত?
বাংলাদেশে পুরো শরীরের এমআরআই পরীক্ষার খরচ সাধারণত ২০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে শরীরের নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গের এমআরআই করতে সাধারণত ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়।
বিদেশের অনেক দেশে পুরো শরীরের এমআরআই পরীক্ষার খরচ প্রায় আড়াই হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন লাখ টাকারও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিকিৎসকদের মতে, এমআরআই অত্যন্ত নির্ভুল, নিরাপদ ও আধুনিক একটি রোগ নির্ণয় পদ্ধতি। তবে সুস্থ মানুষের জন্য নিয়মিত পুরো শরীরের এমআরআই করানো সবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নয়।
যদি শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, পারিবারিকভাবে গুরুতর রোগের ইতিহাস থাকে বা চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করেন, তখন এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় শুধুমাত্র কৌতূহল বা অযথা দুশ্চিন্তা থেকে পুরো শরীরের এমআরআই করানোর আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
আরটিভি/জেএমএ