শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৬:৫১ পিএম
কখনো কি এমন ঊর্ধ্বতন বা সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করেছেন, যিনি মনে করেন সবসময় তিনি সঠিক, এমনকি তিনি ভুল করলেও? অন্যের পরামর্শ বা দক্ষতা স্বীকার না করার এই প্রবণতা কর্মক্ষেত্র বা পরিচিত পরিসরে প্রায়ই দেখা যায়। উচ্চপদস্থদের মধ্যে এই ধরনের 'বস ইজ অলওয়েজ রাইট' মানসিকতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই ব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন, তারা কোনো ভুল করতে পারেন না এবং নিজেদেরকে ত্রুটিহীন মনে করেন।
মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় এই আচরণের নাম ‘গড’স সিনড্রোম’। এটি কোনো শারীরিক রোগ নয়, তবে এটি একটি মানসিক ও আচরণগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।
এই ধরনের মানুষরা নিজেদেরকে অন্যদের উপরে স্থাপন করেন এবং মনে করেন তারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। যদিও নেতৃত্বে আত্মবিশ্বাস অপরিহার্য, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিপজ্জনক এবং কর্মক্ষেত্রের জন্য ধ্বংসাত্মকও হতে পারে।
বিশ শতকের গোঁড়ার দিকে মনোবিদ আর্নেস্ট জন্স প্রথম এই ধরনের মানসিক সমস্যাকে ‘গড’স কমপ্লেক্স’ নামে চিহ্নিত করেছিলেন, যা থেকে পরবর্তীকালে গড’স সিনড্রোমের ধারণাটি আসে।
মনোবিদদের মতে, গড’স সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি শুধু নিজের প্রতিই বিশ্বাসী নন, বরং আশেপাশের মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতাও তাদের মধ্যে দেখা যায়। এদের কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো—তারা বিশ্বাস করেন তাদের অজানা কিছু নেই, তাই অন্যদের মতামত বা অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেন না। তারা অধস্তনদের কথা বা সমস্যায় মনোযোগ দিতে চান না এবং ভালো কিছু ঘটলে নিজেই ক্রেডিট নেন, কিন্তু খারাপ কিছু হলে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপান।
তারা মনে করেন যে তাদের মতো দক্ষ কেউ আর নেই এবং নিজেদের ভুল করার বিষয়টি তারা কখনোই মেনে নিতে নারাজ হন। সাধারণত, তারা এমন মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পছন্দ করেন যারা তাদের ইশারায় চলে এবং অফিসে এমন একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখেন যেখানে কথা বলার আগে অধস্তনদের দশবার ভাবতে হয়।
কর্মক্ষেত্রে যদি কোনো ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি ‘গড’স সিনড্রোম’-এ আক্রান্ত হন, তবে তা পুরো টিমের মনোবল ও উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট হয়, বড়-ছোটের মধ্যে অনাবশ্যক ভেদাভেদ তৈরি হয়, অধঃস্তনদের মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করে এবং অনেক দক্ষ কর্মী কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
এই বিষাক্ত পরিবেশ মোকাবিলার জন্য মনোবিদরা কিছু কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ দেন: প্রথমত, আক্রমণাত্মক ভাবে নয়, বরং দৃঢ়ভাবে তথ্য এবং প্রমাণের ভিত্তিতে যোগাযোগ করুন।
দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত এবং আলোচনার বিষয়গুলো নথিভুক্ত করে রাখুন, যাতে ভুল দোষারোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
তৃতীয়ত, অন্যদের সঙ্গে সমর্থন জোট বা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন, যাতে কর্মক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়েন।
সবশেষে, মনে রাখবেন—কখনো কখনো বিষাক্ত পরিবেশ থেকে দূরে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ; বেতন বা পদমর্যাদার চেয়ে নিজের মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
আরটিভি/এএইচ