মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৯:০৫ পিএম
একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে মাটির হাঁড়ি-কলসি ছিল অপরিহার্য। রান্না থেকে আপ্যায়ন, সবকিছুতেই মাটির তৈরি জিনিসের ব্যবহার ছিল। কিন্তু এখন সিরামিক, প্লাস্টিক বা কাচের সামগ্রী বাজার দখল করে নেওয়ায় সেই চিত্র পাল্টেছে। তবে রুচিশীল সমাজে মাটির পণ্যের কদর এখনো কমেনি। শৌখিন ক্রেতারা ক্যাকটাস সাজানোর জন্য টব, ফুলদানি, শো-পিস, খাবার প্লেট কিংবা মাটির ফিল্টার কিনতে চান। সে কথাই বলছি।
শহরের প্রাণকেন্দ্রের ব্যস্ততা থেকে খানিকটা দূরে দোয়েল চত্বরে গেলেই চোখে পড়ে লালচে আভার মাটির জিনিসপত্রের রঙিন পসরা। সারি সারি সাজানো কলসি, হাঁড়ি, ফুলদানি, শো-পিস, কাপ ও গ্লাস যেন এক মুহূর্তে শেকড়ের টানের অনুভব করায়।
দোয়েল চত্বরের দোকানগুলোয় মাটির কাপ, মগ, জগ, ফুলদানি, শোপিস, পানির ফিল্টার থেকে শুরু করে ক্রোকারিজ, ডিনার সেট, পোড়ামাটির টেরাকোটা, দেয়াল সজ্জার শিল্পকর্ম, এমনকি নারীদের জন্য কানের দুল, বালা বা গলার মালার মতো গহনাও পাওয়া যায়।
এই স্থানটি কেবল একটি বাজার নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের এক জীবন্ত ইতিহাস। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে দোয়েল চত্বরে প্রায় ২৮ বছর ধরে এই ব্যবসা চলছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এই ব্যবসাটি মূলত পাল সম্প্রদায়ের। ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে পালরা এখানে ব্যবসা শুরু করেন। যদিও অনেকেই পেশা বদলেছেন বা মারা গেছেন, তবুও তাদের কিছু বংশধর এখনো এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তাদের বিশ্বাস, মানুষ চলে গেলেও যুগ যুগ ধরে এই ব্যবসা টিকে থাকবে।
মাটি কামড়ে থাকা এসব ব্যবসায়ীদের মতে, যারা শিক্ষিত ও রুচিশীল, তাদের কাছে মাটির জিনিসের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
মৃৎশিল্প তৈরি করা কিন্তু সহজ কাজ নয়। এই শিল্পকর্মের জন্য ঢাকার মাটি উপযোগী নয়। লাগে এঁটেল মাটি, সঙ্গে মেশাতে হয় বালি, দোয়াশ মাটি, এবং কখনো কখনো রাসায়নিকও।
এই বিশেষ ধরনের এঁটেল মাটি সংগ্রহ করা হয় শরীয়তপুর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লার বিজয়পুর বা বরিশালের বগাদিয়া-কনদিয়া অঞ্চল থেকে। উৎপাদনের সময় আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগুনে পোড়ানো। পাঁচ হাজার পণ্য আগুনে দিলে দুই থেকে আড়াই হাজার ভালোভাবে টিকে যায়, বাকিগুলো ফেটে বা নষ্ট হয়ে যায়। উৎপাদনের এই বিপুল ক্ষতি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
যেমন, একটি পানির ফিল্টারের দাম ১৩০০ টাকা হলেও যদি সব পণ্য টিকে যেত, তা অর্ধেক দামে বিক্রি করা যেত।
দোয়েল চত্বরের দোকানগুলোয় সাজানো তৈজসপত্রের দাম শুরু হয় ২৫০ টাকা থেকে, যা কয়েক হাজার পর্যন্ত পৌঁছায়।
আরটিভি/এএইচ