images

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র / জাতীয়

যেভাবে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড়

রোববার, ১৪ মে ২০২৩ , ০৯:১৪ এএম

সমুদ্রে জন্ম নেওয়া দুর্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ঘূর্ণিঝড়। তবে সমুদ্র ছাড়াও ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম হতে পারে, কিন্তু সেই ঘূর্ণিঝড় সমুদ্রে সৃষ্ট ঝড়ের মতো শক্তিশালী হয় না। আবার সমুদ্র একাই ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করে, ব্যাপারটা এমনও নয়। বিশেষ করে সূর্য ও বায়ুমণ্ডলের প্রভাব, বায়ুর ঘনত্বের প্রভাব, তাপমাত্রার পার্থক্যের প্রভাব ইত্যাদি বিষয় জড়িত থাকে একটা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পেছনে।

এ ছাড়া কোনো স্থানে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে উষ্ণ বায়ু ওপরে উঠতে থাকে। তখন আশেপাশের জলীয়বাষ্প পূর্ণ শীতল বাতাস ওই স্থানে চলে আসে। চারপাশ থেকে আসা বাতাসের মিথস্ক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড়ের। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়তে থাকলে এটি আরও মেঘ আর জলীয় বাষ্প পূর্ণ বায়ু বহন করে থাকে।

মূলত ঘূর্ণিঝড় বা ঘূর্ণিবাত্যা হল ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সংবলিত আবহাওয়া একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এই ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। এটিকে সাইক্লোন, টাইফুন, হারিকেন নামেও ডাকা হয়ে থাকে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলোতে, মানে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার মাঝখানের যে অঞ্চলটা সেখানে নিম্নচাপের ফলে তৈরি সামুদ্রিক ঝড়- যাকে ট্রপিক্যাল সাইক্লোন বা ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ও বলা হয়। সাধারণত গরমকালে বা গরমের শেষে উষ্ণ পানিতে সৃষ্টি হয় বায়ুমণ্ডলের এই উত্তাল অবস্থার।

পৃথিবীতে বাংলাদেশের অবস্থান বিষুবীয় অঞ্চলে। গ্রীষ্মকালে বিষুবীয় অঞ্চলে সূর্যের তাপ খাড়াভাবে পড়ে। ফলে এই এলাকার বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তাপমাত্রা বাড়লে বায়ুর প্রসারণ হয় এবং কিছুটা হালকা হয়ে যায়। এরপর তুলনামূলক ভারী বায়ুকে নিচে রেখে হালকাগুলো উঠে যায় ওপরে। ফলে দেখা দেয় বায়ুর চাপের তারতম্য। এই তারতম্য পূরণ করতে ছুটে আসে দূরবর্তী অঞ্চলের বায়ু, যেখানে সূর্যের তাপ এখানকার মতো এতো প্রবল নয়।

বিষুব রেখার অঞ্চল তো আর ছোট কোনো অঞ্চল নয়, অনেক বড়। এখানে বায়ুর চাপের তারতম্যও তাই অনেক বড়ই হবে। আর সেই চাপ পূরণ করতে আসা বায়ুর ধাক্কাও বড় হয়েই আসে। প্রবল বেগে বিস্তৃত এলাকা নিয়ে তৈরি হওয়া বায়ুর এই বিশেষ প্রবাহকেই বলা হয় ঘূর্ণিঝড়।

ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তিস্থল অনুযায়ী এই ক্রান্তীয় সমুদ্র অঞ্চলকে সাতটি বেসিনে ভাগ করা হয়। প্রতি বছর পৃথিবী জুড়ে গড়ে প্রায় ৮০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলেও তাদের বেশিরভাগই মিলিয়ে যায় গভীর সমুদ্রে। তাদের মধ্যে উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে এসে যারা আঘাত করে তাদের কথাই মূলত আমরা শুনতে পাই।

বাতাসের গতি বেগের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। উত্তর আটলান্টিক এলাকায় হারিকেনের শক্তিমাত্রা অনুযায়ী এগুলোকে ক্যাটাগরি-১, ক্যাটাগরি-২ এভাবে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। সাধারণত ক্যাটাগরি-৩ বা তার ঊর্ধ্বমাত্রার হারিকেনকে (বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ মাইলের বেশি) খুবই শক্তিশালী গণ্য করা হয়।

পৃথিবীর মহাসমুদ্রগুলো, গরমকালে সূর্যের প্রখর তাপ শুষে নিয়ে উত্তপ্ত হতে শুরু করে। সমুদ্রের এই উষ্ণ পানি থেকে বের হওয়া তাপকেই  ঘূর্ণিঝড়ের ইঞ্জিন বা শক্তির অন্যতম মূল উৎস বলা যায়। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার জন্য সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বা ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হতে হয়।

সমুদ্রের এই উত্তপ্ত পানি থেকে বাষ্পীভবন শুরু হয়। প্রচুর জলীয় বাষ্প উপরে উঠে ঠান্ডা হতে শুরু করে। এতে তৈরি করে মেঘ, যা বৃষ্টি ও বাতাস হিসেবে শক্তি নির্গত হয়। তবে উষ্ণ বাতাস হালকা হয়ে উপরে উঠে যাওয়ার ফলে ওই জায়গায় ফাঁকা হয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।