রোববার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫ , ১০:৪৫ পিএম
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় মুহূর্ত পার করছে বাংলাদেশ; বিশেষ করে বাংলাদেশিদের একের পর এক ভিসা আবেদন বাতিল করে দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে চরম আকার ধারণ করেছে এ সংকট। এক কথায়, ভিসা যেন সোনার হরিণ হয়ে গেছে বাংলাদেশিদের জন্য। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, পর্যটন কিংবা চাকরিসংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজনেও বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পড়তে হচ্ছে ঘোর বিপাকে।
হাঙ্গেরি ও যুক্তরাষ্ট্রে স্কলারশিপ পাওয়া শিক্ষার্থী তানজুমান আলম ঝুমার অভিজ্ঞতা বর্তমানে অনেকেরই গল্পের সঙ্গে মিলে যায়। এক বছরের বেশি সময় ধরে দুটি দেশে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও তিনি যেতে পারেননি শুধু ভিসা না পাওয়ার কারণে।
তার ভাষায়, বুদাপেস্টে আবেদন করার পর মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও ভিসা পাননি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আবেদন করলেও ফল একই হয়েছে। এমন অভিজ্ঞতার কারণে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি অনেকের শিক্ষাজীবন থমকে যাচ্ছে। শুধু উচ্চশিক্ষার জন্য নয়, কর্মসংস্থান ও পর্যটন ভিসার ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ।
এমনকি ভিয়েতনাম কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো যে দেশগুলো থেকে সহজেই ভিসা পাওয়া যেত এতদিন, তারাও অনেক ক্ষেত্রে ভিসা দিচ্ছে না বলে জানাচ্ছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
অথচ ভারতের পর্যটন ভিসা ছাড়া কার্যত কোনো দেশ থেকেই বাংলাদেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিসার অপব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়ার প্রবণতার কারণে বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে বাংলাদেশিদের। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি বিদ্যমান সংকটকে চরম অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন অনেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়েও তোলা হচ্ছে প্রশ্ন।
এক্ষেত্রে পাসপোর্টের র্যাংকিংয়ে নিচে নেমে যাওয়াও একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে বলেও মনে করছেন অনেকে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে দেশের ভেতরে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানেরও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা না থাকার পরও বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বেশ কয়েকটি দেশ।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম আমাদের ভিসা দিচ্ছে না। শুধু তাই নয়, থাইল্যান্ডের ভিসা অনেক বেশি সময় নেয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার ভিসার রেশিও কম। ফিলিপাইন অনেক বেশি সময় নেয়। ইন্দোনেশিয়ার ভিসা ফি অনেক। এমনকি অন অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া শ্রীলঙ্কার ইলেক্ট্রনিক ভিসা হতেও সময় নিচ্ছে দুই-তিন দিন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয় ভারত। দেশটির এই সিদ্ধান্তকে অনেকটা রাজনৈতিক হিসেবে দেখা হলেও ঘোষণা ছাড়াই ইউরোপ, অ্যামেরিকাসহ এশিয়ার অনেক দেশ থেকে সব ধরনের ভিসা পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতগুলো দেশের ভিসা নিয়ে এমন জটিলতা খুব বেশিদিনের না। এ ব্যাপারে পর্যটন ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন সেলিম জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছরই বাংলাদেশিদের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভি১, ভি২ ভিসা দিয়ে থাকে। কিন্তু এই বছর দেশটির দূতাবাস ‘মনে হয় না দুই লাখের বেশি ভিসা দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া কিংবা কানাডা; যে দেশের কথাই ধরুন না কেন, তারা কিন্তু ২০২৩-২৪ সালে আমাদের অনেক ভিসা দিয়েছে; পাসপোর্টের মেয়াদ যতদিন, ততদিন পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু এ বছর কিন্তু কোনো ভিসা দিচ্ছে না এই দেশগুলো।
কেন ভিসা দিচ্ছে না বিভিন্ন দেশ?
চরমে ওঠা এই ভিসা জটিলতার কারণ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকেই দায়ী করছেন বেশিরভাগ বিশ্লেষক। অনেকে আবার বলছেন, এর মূল আরও গভীরে। তাদের মতে, অনিয়মিত পথে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দেশে ঢোকার প্রবণতা, আর তা করতে সহজলভ্য দেশের ভিসা নিয়ে অন্যদেশে পাড়ি জমানোর ঘটনা দেশগুলোর প্রশাসনের চোখে পড়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ভিসা পাওয়ার সুযোগে বা এটাকে অপব্যবহার করে অনেকে কিন্তু অনিয়মিতভাবেও যাচ্ছে। সেই প্রবণতার কারণেই আমার ধারণা যে দেশগুলোতে খুব বেশি অভিবাসনবিরোধী বাতাবরণ নেই, সেই দেশগুলোও এখন সতর্ক হচ্ছে।
আবার প্রতিবেশী দেশ থেকে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা ভিসা নিয়ন্ত্রণের কারণে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু দেশ আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
একইসঙ্গে বিদেশে গিয়ে প্রকাশ্যে কোন্দল বা বিবাদে জড়ানোর ঘটনাও দেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে নানা দেশের ভিসা জটিলতায়।
ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে পাসপোর্টের র্যাংকিংয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক নাগরিকত্ব ও পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্যমতে, দুর্বলতম পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বিশ্বের ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগ আছে বাংলাদেশের নাগরিকদের। এই তালিকার বেশিরভাগ দেশই আফ্রিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের, যেখানে বাংলাদেশিদের যাতায়াতের প্রবণতাও কম।
এছাড়াও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অবৈধ অভিবাসনের সুযোগ খোঁজার প্রবণতা বেড়েছে।
সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ কী?
গত বছর ডিসেম্বরে ভারতের ভিসা সীমিত থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে অন্য দেশে সরাতে কূটনীতিকদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এর তিন মাস পর মার্চ মাসে ঢাকা থেকেই নয়টি দেশের ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়, কিন্তু সেই দেশগুলো থেকেও ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যাচ্ছে।
কয়েক মাস আগে সংবাদমাধ্যমে ভিসা জটিলতার কথা স্বীকার করে নেন পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা; দায়ী করেন, বাংলাদেশিদের কর্মকাণ্ডকে। কিন্তু, উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ভ্রমণ ভিসার ক্ষেত্রে জটিলতার বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ নেই। তবে, ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোতে কূটনৈতিকভাবে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে, অভ্যন্তরীণভাবে অনিয়ম প্রতিরোধ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশে অনিয়মিত পথে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভ্রমণ ভিসাকে অপব্যবহার করে যারা শ্রমিক পাঠাচ্ছে—তাদের বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়ন করা এবং সরকারি পর্যায়ে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করা হলে দেশগুলো বাংলাদেশিদের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে।
আরটিভি/এসএইচএম