images

জাতীয়

দলিল থাকলেও টিকবে না যেসব জমির দখল 

বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫ , ০৭:৪২ পিএম

ভূমি আইন, রেকর্ড-ব্যবস্থার জটিলতা, সরকারি খাস ঘোষণা এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে বহু মানুষ দলিল থাকা সত্ত্বেও জমির মালিকানা ধরে রাখতে পারেন না। দলিল থাকা মানেই নিরাপদ দখল নয়; বরং জমির দখল টিকিয়ে রাখতে হলে দলিল, রেকর্ড ও বাস্তব দখল-এই তিনটি শর্ত পূরণ থাকা জরুরি। 

জমি নিয়ে সিভিল মামলা, রিট বা আদালতের নিষেধাজ্ঞার মতো পরিস্থিতি থাকলে বৈধ দলিল থাকা সত্ত্বেও মালিক দখল রাখতে পারেন না। আদালত নিষেধাজ্ঞা দিলে জমির ওপর কোনো পক্ষই কাজ করতে পারে না। দেশে এমন অসংখ্য জমি দীর্ঘদিন ধরে মামলাজট অবস্থায় পড়ে আছে, যেখানে দলিলধারী মালিক বাস্তবে দখল পান না। সরকারঘোষিত খাসজমিও দখল হারানোর অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যক্তিমালিকানার দলিল থাকা সত্ত্বেও জমিটি নথিতে খাস হিসেবে চিহ্নিত থাকে বা পরে খাস ঘোষণা করা হয়। বিশেষ করে নদীভাঙা এলাকায় নতুন করে জেগে ওঠা চর জমির ক্ষেত্রে পূর্ব মালিকরা দাবি তুললেও আইন অনুযায়ী তা সাধারণত খাস হিসেবেই গণ্য হয়। 

পরিত্যক্ত বা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত জমির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। কোনো জমিতে মালিকের দখল ১০ থেকে ১২ বছর ধরে না থাকলে এবং জায়গাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে অনেক সময় তা সরকারি খাসজমির তালিকায় চলে যায়। এ অবস্থায় দলিলধারী মালিকের পুনরায় দখল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি দলিল, ভুয়া রেজিস্ট্রি বা প্রতারণামূলক কাগজপত্র জমির দখল নষ্ট হওয়ার আরেকটি বড় কারণ। এসব দলিল আদালতে বাতিল হয়ে গেলে দলিলধারী ব্যক্তিরও কোনো অধিকার থাকে না। 

পাশাপাশি রেকর্ডের সঙ্গে দলিলের অমিল থাকলেও দখল নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। রেকর্ড মালিকানা যদি অন্য কারো নামে থাকে, তবে দলিল থাকা সত্ত্বেও দখল ধরে রাখা যায় না। এ অবস্থায় আদালতের মাধ্যমে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হয়। দেশের নদী ভাঙনপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে জমি দখল টেকার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। আত্রাই, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও মেঘনার মতো নদীর ভাঙনে জমি বিলীন হলে তার দখলও শেষ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নদী সরে গিয়ে জমি জেগে উঠলেও তা আইনে খাস হিসেবেই গণ্য হয়-যদি না মালিক তার দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেন। 

সরকারি প্রকল্প বা উন্নয়ন কাজে জমি অধিগ্রহণ হলে ব্যক্তিগত দলিল থাকা সত্ত্বেও জমির দখল টিকিয়ে রাখা যায় না। সে ক্ষেত্রে মালিক ক্ষতিপূরণ পেলেও জমি আর ফিরে পান না। তা ছাড়া রেলওয়ে, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বন বিভাগ বা অন্যান্য সরকারি সংস্থার নামে রেকর্ড থাকা জমি ব্যক্তির নামে দলিল করা হলেও দখল টেকসই হয় না। দেশে জমি নিয়ে বিরোধের বড় কারণ হচ্ছে দলিল, রেকর্ড ও দখল-এই তিনটির অমিল। তাই যেকোনো জমি ক্রয়ের আগে দলিল যাচাই, রেকর্ড মিল, নামজারি সম্পন্ন করা এবং বাস্তব দখলে থাকা-এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করাই নিরাপদ ভূমি মালিকানার প্রধান শর্ত। 

দলিল থাকা সত্ত্বেও ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মধ্যে পাঁচ ধরনের জমির দখল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক সরকারি পরিপত্র ও প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। পাঁচ ধরনের জমির মধ্যে রয়েছে-১. যেসব সাব-কবলা দলিল উত্তরাধিকার বণ্টন না করে করা হয়েছে। কোনো ওয়ারিশকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সেগুলো বাতিলযোগ্য। বঞ্চিত উত্তরাধিকারী আদালতে মামলা করলে দখলদারের দলিল খারিজ হয়ে যেতে পারে। ২. যেসব হেবা দলিল দাতার সম্পূর্ণ মালিকানায় ছিল না, সঠিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ না করা বা শর্ত ভঙ্গ করে করা হয়েছে, সেগুলোও বাতিলযোগ্য। ৩. বর্তমানে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে জাল দলিল শনাক্ত করা সহজ হয়েছে। 

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির মাধ্যমে তৈরি দলিলও বাতিল হবে, যদি প্রকৃত মালিক যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন করেন। ৪. সরকারি খাস খতিয়ানে থাকা জমি যদি কেউ নিজের নামে করে বিক্রি করে থাকে, তবে সেই দলিল বাতিল হবে এবং জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাবে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসককে আইনি লড়াইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৫. যুদ্ধপরবর্তী সময়ের পরিত্যক্ত অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তিগতভাবে দখলে রাখা যাবে না। এসি ল্যান্ডের মাধ্যমে এসব জমি চিহ্নিত করে সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

আরটিভি/এএ