images

জাতীয়

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফকে নিয়ে সেনাবাহিনীর পোস্ট

সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১০:২৭ পিএম

বিজয়ের মাসে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) রাত ৯টায় দেওয়া পোস্টে বলা হয়, বিজয়ের মাসে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফকে। সেই অকুতোভয় বীর যিনি জীবন উৎসর্গ করে রচনা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তার বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম চিরকাল আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

মুন্সি আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালের ১ মে ফরিদপুর জেলার বোয়ালখালি থানার সালামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ইপিআর সদস্য চাচার উৎসাহে আব্দুর রউফ একদিন ইপিআরে যোগদানের জন্য লাইনে দাঁড়ান। প্রাথমিক সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬৩ সালের ৮ মে তিনি চুয়াডাঙ্গা ইপিআর ক্যাম্পে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৭১ সালে কুমিল্লাতে দায়িত্ব পালনকালে মুন্সি আব্দুর রউফ বিক্ষুব্ধ জনতার আন্দোলন ও স্বাধীনতা প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা প্রত্যক্ষ করেছেন। দেশের উত্তাল অবস্থার মধ্যেই কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের ১১নং উইংয়ে মুন্সি আব্দুর রউফের বদলি হয়। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরু হলে মুন্সি আব্দুর রউফ অন্যান্য বাঙালি সৈনিকদের সাথে বিদ্রোহ করেন। পরবর্তীকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডে যুদ্ধে সক্রিয় থাকেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট চট্টগ্রাম শহর থেকেই তাদের প্রাথমিক প্রতিরোধ শুরু করলেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে তারা কৌশলগত কারণে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে। তারই অংশ হিসেবে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী একটি কোম্পানি নিয়ে বুড়িঘাট ও রাঙামাটির মধ্যস্থলে চিংড়িখাল এলাকা বরাবর প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি সেই কোম্পানিতে মেশিনগানার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। কোম্পানিটির দায়িত্ব ছিল মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি-জালিয়াপাড়া সড়কটি নিরাপদ রাখা। কেননা বিদ্রোহী সৈনিকদের রামগড়ে (মুক্তিবাহিনীর প্রাথমিক হেডকোয়ার্টার) পৌঁছানোর এই একটি পথই খোলা ছিল।

এদিকে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীও বিদ্রোহী বাঙালি সৈনিকগণ যাতে এই পথ ধরে রামগড়ের উদ্দেশ্যে সহজে পুনর্মোতায়েন করতে না পারে সেজন্য এই সড়ক পথ এবং রাঙামাটি-বুড়িঘাট-নানিয়ারচর জলপথটি নিজেদের দখলে রাখার জন্য খুবই তৎপর হয়ে ওঠে। ১৭ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের ২০ জন সৈন্যকে এলাকাটি রেকি (পর্যবেক্ষণ) করার জন্য প্রেরণ করলে রেকি দলটি মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে (ফাঁদ) পড়ে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

৩ দিন পর অর্থাৎ ২০ এপ্রিল অ্যামবুশে ক্ষয়ক্ষতির প্রতিশোধ এবং বুড়িঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের এক কোম্পানি কমান্ডো সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানে আক্রমণের জন্য প্রেরণ করে। সৈন্য বহরে ৩টি লঞ্চ ও দুটি স্পিডবোট ছিল। এগুলোর মধ্যে ৬টি ৩ ইঞ্চি মর্টার ছাড়াও অনেকগুলো মেশিনগান ও রাইফেল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ও সক্রিয় অবস্থায় স্থাপন করা হয়েছিল।

শত্রুবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল মহালছড়ির মূল প্রতিরক্ষা অবস্থানকে ধ্বংস করা। বুড়িঘাটের মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা অবস্থানের কাছে এসেই শত্রুরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে হামলা চালায়। পাকিস্তানি সৈন্যদের তীব্র আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সাহসী যোদ্ধা ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ তখন নিজের পরিখায় অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে শত্রুর ওপর অবিরাম গুলি বর্ষণ করে যাচ্ছিলেন। তার মেশিনগান থেকে অবিরত গুলি বর্ষণের প্রচণ্ডতায় শত্রুর আক্রমণ কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

সহযোদ্ধাদের পশ্চাদপসরণ নির্বিঘ্ন করতে মুন্সি আব্দুর রউফ একাই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্যদের পশ্চাদপসরণ করতে বলেন। নিজের জীবন বিপন্ন করেও সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে তিনি সেদিন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার মেশিনগান হতে ক্রমাগত গুলি বর্ষণে পাকিস্তানি সেনা বহরের দুটি লঞ্চ ও একটি স্পিডবোট ডুবে যায়। এতে শত্রুর দুটি প্ল্যাটুন সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। অস্ত্র ও জনবলের ব্যাপক এই ক্ষয়ক্ষতিতে পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু অন্য লঞ্চটি মুন্সি আব্দুর রউফের মেশিনগানের আওতার বাইরে চলে যায় এবং নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিয়ে আবারও মর্টারের গোলা বর্ষণ শুরু করে। হঠাৎ শত্রুর মর্টারের একটি গোলা সরাসরি ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফের এমজি পোস্টে আঘাত হানে। স্তব্ধ হয়ে যায় মেশিনগানের গোলা বর্ষণ। শহিদ হন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানী মুন্সি আব্দুর রউফ। 

একই দিন সহযোদ্ধারা তার মৃতদেহ উদ্ধার করে অত্যন্ত বেদনা ভারাক্রান্তচিত্তে তাকে চিংড়িখাল সংলগ্ন একটি টিলার ওপর সমাধিস্থ করেন। এই যুদ্ধে শহিদ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ যে নিপুণতা, শৌর্যবীর্য ও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তার স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে।

বীরত্ব, দেশ ও সহযোদ্ধার প্রতি আবেগ এবং নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধের অনন্যসাধারণ যে উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছেন তা নিঃসন্দেহে তাকে একজন দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসেবে অনন্য করে তুলেছে। ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ নামটি তাই সকলের মনে চিরন্তন প্রেরণার প্রতীক হয়ে আছে।

আরটিভি/আরএ