images

জাতীয়

গণভোট ঘিরে সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা কতটা যৌক্তিক?

শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬ , ০১:৫৪ পিএম

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অতীতের যেকোনও নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনের আবহ একেবারে অন্যরকম। কারণ, এবারের নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে আয়োজন হতে যাচ্ছে গণভোট। আর অনুষ্ঠেয় এ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। 

অথচ, এ সরকারেরই জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এই গণভোট ‘সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার’ সঙ্গে পরিচালনা করতে আইনত বাধ্য নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একদিকে আসন্ন গণভোটে সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান, অন্যদিকে আইনি বাধ্যবাধকতা— উভয়ের টানাপোড়েনে এখন এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন নির্বাচন কমিশন।

জানা গেছে, ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণাকে জোরদার করতে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। এর অংশ হিসেবে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনই নয়, বরং এনজিও এবং তৈরি পোশাক খাতের (আরএমজি) মতো বেসরকারি খাতকেও কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমের ঘোষিত লক্ষ্য হলো—জুলাই জাতীয় সনদের অনুমোদনের পক্ষে দেশব্যাপী একটি জনজোয়ার সৃষ্টি করা।

এই পদক্ষেপগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান নিয়ে আর কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। সরকার কার্যকরভাবে গণভোটের একটি ‘পক্ষ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং প্রকাশ্যে ‘না’ ভোটের বিরোধিতা করছে। এর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট—জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং মাঠপর্যায়ের অন্য কর্মকর্তারা যদি 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারের জন্য নির্বাহী নির্দেশ মেনে চলেন, তবে গণভোটের আগে তাদেরকে আর নিরপেক্ষ প্রশাসক হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

বিপরীতে, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। তাদের বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় কেবল ব্যালটের প্রস্তাবনাগুলো ব্যাখ্যা করা হচ্ছে এবং ভোটারদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে কীভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে, ইসির এই পদক্ষেপ গণভোট অধ্যাদেশের নিরপেক্ষতার শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন উভয়ই একই মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল।

আরও পড়ুন
LIpy

মতপার্থক্য থাকলেও মতবিরোধ যেন না হয়: তারেক রহমান

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের জন্য ইসি ডিসি ও ইউএনওদের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে সরকারি গেজেটে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত, এই কর্মকর্তারা ইসির নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় কাজ করেন— সরকারের অধীনে নয়। এই সময়ে ইসির অনুমোদন ছাড়া সরকার তাদের বদলি করতে পারে না এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হলে তা ‘নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১’-এর অধীনে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

একবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলগুলোর জন্য প্রযোজ্য নির্বাচনী আচরণবিধি বর্তমান প্রচারণা ও গণভোটের জন্যও প্রযোজ্য।

এ জায়গাটায় আরও গভীর আইনি জটিলতা। গণভোট অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারাই পদাধিকারবলে গণভোট পরিচালনার কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য হবেন। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত হওয়ার পর উভয় প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে তারা আইনত বাধ্য।

অথচ কর্মকর্তাদের একটি ‘সচেতনতামূলক’ প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, যেখানে সুস্পষ্টভাবে প্ররোচনামূলক বার্তা রয়েছে। যেমন: সব সংস্কার বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোট দিন; না ভোটে কিছুই মিলবে না। পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ ভোট দিন।

জুলাই জাতীয় সনদে ১১টি প্রধান সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— একতরফা সংবিধান সংশোধনে সীমাবদ্ধতা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা ১০ বছর করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতায় লাগাম টানা এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২৬টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করলেও বিএনপি ৯টি প্রস্তাবে ভিন্নমত পোষণ করে 'নোট অব ডিসেন্ট' দিয়েছিল আর জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি দল এতে স্বাক্ষর করেনি।

জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। বিএনপি, যারা এর আগে ভিন্নমত বা 'নোট অব ডিসেন্ট' গণভোটের ব্যালটে অন্তর্ভুক্ত না করায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশের সমালোচনা করেছিল, তারা এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের হয়েই প্রচারণা চালায়নি। দলটি মূলত সংসদ নির্বাচনের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।

২০ জানুয়ারির পর নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠলে এই বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারের প্রকাশ্য 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারণা গণভোটের পক্ষে ওকালতি এবং নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্তর্বর্তী সরকার এবং ইসি উভয়ই বারবার ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অথচ, গণভোট নিয়ে এই মুহূর্তে তাদের অবস্থান পরস্পরবিরোধী বলে মনে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের অভিমত, গণভোটের ফলাফল প্রভাবিত করতে সরকারের সরাসরি প্রচারণা ভোট প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের শামিল এবং এটি রাজনৈতিক অঙ্গনকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। যে কেউ গণভোটের ফলাফল আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, সরকার গণভোটের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারে, কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো উচিত নয়।

আরটিভি/এসএইচএম