বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬ , ০৪:১৭ পিএম
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও খোলা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে শ্রম অভিবাসন বিষয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শ্রমবাজার খোলা ও ব্যয় কমানো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এতে মালয়েশিয়ার খাতভিত্তিক চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং একটি ন্যায্য, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়।
শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করতে গত বুধবার মালয়েশিয়ায় যান শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে মাহদী আমিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্রও। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করতে এটি প্রথম সফর।
বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বাংলাদেশের হাইকমিশনার। বৈঠকের শুরুতে আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি দেশের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিনের সংগ্রাম এবং এর অব্যাহত অগ্রগতিরও প্রশংসা করেন। উভয় পক্ষ শ্রম সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং শ্রমিকদের শোষণ রোধে একটি স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির উপায় নিয়েও আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করে। এছাড়াও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে শিক্ষক বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতাসহ শিক্ষা খাতে সহযোগিতার সুযোগ নিয়েও আলোচনা করা হয়। উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রযাত্রায় সন্তোষ প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
এর আগে পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে শ্রম অভিবাসন বিষয়ে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী দাতো শ্রী রমনন রামকৃষ্ণন এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
শ্রম অভিবাসন বিষয়ে বৈঠক প্রসঙ্গে দুই দেশ যৌথ প্রেস বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় দেশ শ্রম অভিবাসনে তাদের দীর্ঘস্থায়ী ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক অংশীদারিত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাস্তবসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এর লক্ষ্য বিদ্যমান নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবেলা করার পাশাপাশি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করা।
উভয় পক্ষ মালয়েশিয়ার খাতভিত্তিক চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং একটি ন্যায্য, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যস্থতাকারী ও অভিবাসন ব্যয় কমানোর জন্য কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা, বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্য নিয়োগকারী সংস্থা ব্যবহার এবং আটকে পড়া শ্রমিকদের নিয়োগ দ্রুত সহজতর করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ।
যৌথ প্রেস বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বৈঠকে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সকল উৎস দেশের জন্য প্রযোজ্য একটি প্রযুক্তিনির্ভর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করা হয়। এর লক্ষ্য হলো মধ্যস্থতাকারী কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করা এবং নিয়োগকর্তারা যেন নিয়োগের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করেন তা নিশ্চিত করা। এর ফলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী ‘নিয়োগকর্তাই অর্থ প্রদান করবেন’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের জন্য ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্যান্য সব প্রেরণকারী দেশকে সম্পৃক্ত করে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে এ ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়।
আরও বলা হয়, উভয় পক্ষ শ্রমিক নিয়োগে মানব পাচারসংক্রান্ত চলমান আইনি মামলা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়েও আলোচনা করেছে। মালয়েশিয়ার পক্ষ তাদের আন্তর্জাতিক সুনামকে প্রভাবিত করতে পারে এমন যেকোনো ভিত্তিহীন বা বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ আইনের শাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া, জবাবদিহিতা এবং সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
এছাড়া অনিয়মিত কর্মীদের সম্মুখীন হওয়া প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা এবং শ্রম সরবরাহকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও ভালোভাবে সমন্বয় করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, সনদ প্রদান এবং তথ্য আদান-প্রদানে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
গঠনমূলক আলোচনায় উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করে এবং নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে সম্মত হওয়ার মধ্য দিয়ে বৈঠক শেষ হয়। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল উষ্ণ আতিথেয়তা এবং পুত্রজায়ায় বৈঠকটি আয়োজনের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
আরটিভি/এমএইচজে