images

জাতীয় / অর্থনীতি

১৬ বছরের লাগামহীন লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে: অর্থমন্ত্রী

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ , ০৫:০০ পিএম

বিগত ১৬ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ফলে দেশের অর্থনীতি আজ ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, শুধু অর্থনীতিই নয়, বরং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিটি খাতকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের সামষ্টিক অর্থনীতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসন ও ভুল নীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৭৩ শতাংশে।

আরও পড়ুন
Bazar_Tel010

রাজধানীতে ভোজ্যতেলের তীব্র সংকট

শিল্প ও কৃষি খাতের বিপর্যয় তুলে ধরে তিনি জানান, ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, বর্তমানে তা মাত্র ৩.৫১ শতাংশে ঠেকেছে। একইভাবে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি ৫.৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৩.৩০ শতাংশ হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী দেশের শ্রমবাজারের গভীর সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গত এক দশকে শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষির ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত থাকলেও জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) এই খাতের অবদান মাত্র ১১.৬ শতাংশ। এর ফলে ছদ্ম-বেকারত্ব বাড়ছে এবং তরুণ শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে।

বিবৃতিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, অর্থনীতির সূচকগুলো কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হলেও বাস্তব চিত্র অত্যন্ত নাজুক। এই ‘কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি’ দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

আমীর খসরু বলেন, ২০০১-০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় জিডিপির ২৯.৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ছিল ২৮.৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র উল্টে গেছে, বিনিয়োগ জিডিপির ৩০.৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় নেমে এসেছে ২৮.৪২ শতাংশে। 

বিনিয়োগ সঞ্চয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা বৈদেশিক উৎস হতে সংস্থান করা হয়েছে। ফলে বহিঃ খাতের ওপর চাপ বেড়েছে। ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭.২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা হয়েছে ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ টাকায়।

ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতাকে কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। 

২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ (এম২) প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৩ শতাংশ ও রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩.৯ শতাংশ, যা অর্থনীতিতে প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়।

তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭.৭ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৯ শতাংশ। জুন ২০০৬-এ অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৫ শতাংশ, যা ২০২৫-এ নেমে এসেছে ৬.৭ শতাংশে। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধিও ২১.১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপের বহিঃপ্রকাশ। 

২০০৫-০৬ সালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.৩ শতাংশ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সময়ে মুদ্রানীতির অব্যবস্থাপনাসহ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৯.৮ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০২৪-২৫ সালে আরও কমে ৬.৫ শতাংশে এসে পৌঁছেছে।

রাজস্ব আদায় নিয়ে আমীর খসরু বলেন, বিগত সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায়ও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক মাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব হয়নি এবং রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমাবদ্ধ থেকেছে। ২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮.২ শতাংশ। ব্যয় ছিল ১১.১ শতাংশ, ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২.৯ শতাংশ। 

২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪,০৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮.২ শতাংশেই স্থির থাকে। অন্যদিকে, ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২.২ শতাংশে, ফলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪.০৫ শতাংশে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজেট ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, শুধু বাজেট ঘাটতি যে বেড়েছে তাই নয়, এ বৃদ্ধির মানও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত এবং এগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। 

ফলশ্রুতিতে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেননি। লুটপাটের মাধ্যমে লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে বিশদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

আরটিভি/এমআই