শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ , ০৩:০০ পিএম
রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও ৬০ দিনের জন্য ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের অস্থিরতার মাঝে এটি বাংলাদেশের ওপর থাকা জ্বালানি সরবরাহের চাপ সাময়িকভাবে লাঘব করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (১১ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হওয়া এই ছাড়ের মেয়াদ আগামী ৯ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে, ১২ মার্চ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রুশ অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য-সংক্রান্ত লেনদেনে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ১১ এপ্রিল।
তবে, সেই লাইসেন্সটি শুধু ১২ মার্চ বা তার আগে জাহাজে তোলা পণ্যবাহী কার্গোর জন্য প্রযোজ্য ছিল। মূলত, ট্রানজিটে থাকা বা পথে থাকা চালানগুলো খালাস করতেই সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, আগের ছাড়টি দেশের জন্য তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি। কারণ, সেই সময় সমুদ্রপথে রাশিয়ার কোনো তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশের পথে ছিল না।
নতুন এই ৬০ দিনের ছাড়ের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিতে সাময়িক স্বস্তি আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া থেকে পরিশোধিত জ্বালানি; বিশেষ করে ডিজেল সংগ্রহ করা যাবে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তবে, আমরা এখনও অফিসিয়াল ডকুমেন্ট হাতে পাইনি।
বাংলাদেশ আমদানিকৃত পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। কিন্তু, দামের অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহকারীদের থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি পেতে হিমশিম খাচ্ছে দেশ।
এর আগে, গত ৩০ মার্চ মার্কিন সরকারকে পাঠানো এক চিঠিতে জ্বালানি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য এই নিষেধাজ্ঞায় ছাড় চেয়েছিল। ওই চিঠিতে বিশ্ববাজারে ‘জ্বালানি তেলের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি’ এবং ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত উৎসগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চ্যালেঞ্জগুলো’ উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি সম্পদের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতার কারণে রাশিয়া এখন একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক দফা উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই ছাড়ের আবেদনটি করা হয়েছিল। গত ১৮ মার্চ একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের পর ২০ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে চিঠি দেয় বিপিসি।
ওই বৈঠকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস ও জ্বালানি বিভাগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
জ্বালানি বিভাগ তাদের চিঠিতে রুশ উৎস থেকে অন্তত ১০ লাখ টন ডিজেল আমদানির সুবিধার্থে সর্বনিম্ন দুই মাসের জন্য এই ছাড়ের একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরে। এতে আরও বলা হয়, আমদানির পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন মেনে সম্পন্ন করতে বিপিসি একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছে।
জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, এই উদ্যোগটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা আরও বাড়বে।
কর্মকর্তারা জানান, এর আগে জেনারেল লাইসেন্স ১৩৪-সহ যেসব মার্কিন বিধান ছিল, তা বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। কারণ, ১২ মার্চ যখন ওই অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন রাশিয়ার কোনো কার্গো বাংলাদেশের অভিমুখে ছিল না। সেই লাইসেন্সটি কেবল ১২ মার্চ বা তার আগে জাহাজে তোলা হয়েছে, এমন রুশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি, সরবরাহ বা খালাস করার অনুমতি দিয়েছিল। তবে, ওই লাইসেন্সের আওতায় নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য নিরাপদ ডকিং, ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জরুরি মেরামত, বাঙ্কারিং, বিমা ও জাহাজের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের অনুমতি ছিল।
উল্লেখ্য, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ জ্বালানি রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে। তবে, সহযোগী দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ছাড়ের মেয়াদ থাকাকালীন আমদানির পরিকল্পনাগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এটি করতে পারলে দেশের বাজারে জ্বালানির সম্ভাব্য ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি অস্থিরতা রোধ করা যাবে। বিপিসি এখন দ্রুততম সময়ে রুশ ডিজেল আমদানির জন্য ক্রয়প্রক্রিয়া ও লজিস্টিক-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত এই সিদ্ধান্তটি বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
আরটিভি/এমএম