মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ , ০৮:৩২ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের বিভাজন চূড়ান্ত হয়েছে। এই ৫০টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একটি আসন পাবে।
নির্বাচনের পর থেকেই সাধারণ মানুষের মনে একটি সাধারণ কৌতূহল কাজ করে—সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা কি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতো একই বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পান? বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। আইন অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচিত এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার কোনো পার্থক্য নেই। তারা সবাই সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করেন।
সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধাগুলো নির্ধারিত হয় ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট (রিমিউনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার, ১৯৭৩’ বা ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’ অনুযায়ী। ২০১৬ সালে এটি সর্বশেষ সংশোধন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি এ বিষয়ে বলেন, সংসদ সদস্য মানেই সংসদ সদস্য। সংরক্ষিত বা সরাসরি নির্বাচিত—উভয় ক্ষেত্রেই যোগ্যতার মানদণ্ড এবং সুযোগ-সুবিধা একই। একজন নির্বাচিত এমপি যে হারে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা পেয়ে থাকেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরাও ঠিক একই হারে সেগুলো পেয়ে থাকেন।
একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা। এর বাইরে রয়েছে বিভিন্ন খাতের ভাতা। যেমন—নির্বাচনি এলাকা পরিচালনার জন্য মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা পান একজন এমপি। মাসিক আপ্যায়ন ভাতা বাবদ দেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা। পরিবহন খাতের জন্য মাসিক ৭০ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারিত রয়েছে, যার ভেতরে জ্বালানি খরচ, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকের বেতন অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও নির্বাচনি এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা অফিস ব্যয় ভাতা পান তারা।
ব্যক্তিগত দৈনন্দিন প্রয়োজনেও সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। লন্ড্রি বা ধোলাই খরচ বাবদ মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং বাসনপত্র, বিছানাপত্র ও টয়লেট্রিজসহ বিবিধ দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য ৬ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। এই ভাতাগুলোর ওপর কোনো আয়কর দিতে হয় না, অর্থাৎ এগুলো সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত।
পরিবহন সুবিধার বড় একটি অংশ হলো শুল্ক ও করমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ। সংসদ সদস্য তার মেয়াদকালে নির্ধারিত শর্ত মেনে একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন। তবে বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা জনস্বার্থে এই শুল্ক ও করমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা গ্রহণ করবেন না বলে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
ভ্রমণ ও যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। সংসদের অধিবেশন, কমিটির সভা বা দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেল, বিমান বা নৌপথে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড়গুণ টাকা তারা ভাতা হিসেবে পান। সড়কপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ভাতা প্রদান করা হয়। এছাড়া দেশের ভেতরে যাতায়াতের জন্য বছরে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা অথবা সমমূল্যের ট্রাভেল পাস সুবিধা রয়েছে। অধিবেশন বা কমিটির সভায় উপস্থিত থাকার জন্য দৈনিক ভাতা হিসেবে ৮০০ টাকা এবং যাতায়াত ভাতা হিসেবে ২০০ টাকা পান তারা। দায়িত্বের খাতিরে অন্য কোথাও অবস্থান করলে দৈনিক ৭৫০ টাকা ভাতা ও ৭৫ টাকা যাতায়াত ভাতা বরাদ্দ থাকে।
চিকিৎসা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যরা অত্যন্ত গুরুত্ব পান। সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে তাদের। এছাড়া মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ১০ লাখ টাকার বিমা সুবিধা রয়েছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য প্রতিটি সংসদ সদস্য বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঐচ্ছিক অনুদান তহবিলের অর্থ ব্যয় করতে পারেন। টেলিযোগাযোগ সুবিধার অংশ হিসেবে বাসভবনে সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ এবং মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিল বাবদ বরাদ্দ থাকে। অর্থাৎ, সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্যদের প্রাপ্ত সব সুযোগ-সুবিধা সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যরাও সমানভাবে উপভোগ করে থাকেন।
আরটিভি/এআর