images

জাতীয়

ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনায় বদলে যাচ্ছে সরকারি সেবা

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ , ০৪:৪৯ পিএম

সরকারি দপ্তরে কাগজনির্ভর কার্যক্রম কমিয়ে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে দেশে ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ফলে সরকারি সেবায় সময় ও ব্যয় কমছে। 

পাশাপাশি নাগরিক সেবা আগের তুলনায় অনেক সহজ ও কার্যকর হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং এটুআই কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ই-নথি বা ই-ফাইলিং চালু রয়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তারা অফিসে উপস্থিত না থাকলেও অনলাইনের মাধ্যমে নথি নিষ্পত্তি, অনুমোদন ও দাপ্তরিক যোগাযোগ সম্পন্ন করতে পারছেন।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি বলেন, মন্ত্রণালয়ের ৮০ শতাংশ ফাইলের কাজ এখন ডিজিটালভাবে করা হচ্ছে। এতে সরকারি ফাইল নিষ্পত্তিতে সময় কমে আসছে। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও দ্রুত কার্যকর হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির জানান, একসময় সরকারি ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যেতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেত।

বর্তমানে ই-ফাইলিং চালুর ফলে অনেক নথি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে যেমন প্রশাসনিক গতি বেড়েছে; তেমনি দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় দেরিও কমেছে।

অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, আগে ফাইলে নোটশিট পরিবর্তনের সুযোগ থাকত। আবার অনেকে নিজেদের হীন স্বার্থে অনেক সময় ফাইলের নোটশিট পরিবর্তন করে ফেলত। এখন ডিজিটাল নথি হওয়ার কারণে আগের মতো নোটশিট পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ফলে দুর্নীতিও অনেকাংশে কমে আসছে বলা যায়।

তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা ঢাকা বা দেশের বাইরে থাকলেও তিনি ফাইলে তার সম্মতি দিয়ে সই করতে পারছেন। সময় অপচয়ের সুযোগ থাকছে না। এতে সরকারি কাজের গতি, ট্রান্সপারেন্সি ও স্বচ্ছতা বেড়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি অফিসগুলোকে ধাপে ধাপে ‘স্মার্ট অফিসে’ রূপান্তর করা হচ্ছে। এর আওতায় ই-ফাইলিং, ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ, অনলাইন মিটিং, ভার্চুয়াল দাপ্তরিক যোগাযোগ, অনলাইন ছুটি ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল হাজিরা এবং সেবার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের মতো কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন হাজার হাজার ই-নথি বিভিন্ন দপ্তরে নিষ্পত্তি হচ্ছে। 

এতে কাগজ, প্রিন্টিং ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

কর্মকর্তাদের মতে, ই-ফাইলিং চালুর ফলে বছরে বিপুল পরিমাণ কাগজের ব্যবহার কমেছে, যা পরিবেশবান্ধব প্রশাসন গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-ফাইলিং শুধু প্রশাসনিক আধুনিকায়ন নয়, এটি সরকারি সেবার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনছে।

ফাইল কোথায় আটকে আছে তা জানতে অতীতে নাগরিকদের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হতো। এখন ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই নথির অগ্রগতি সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনগুলোতে ভূমি সেবা, নামজারি, বিভিন্ন সনদ প্রদান, লাইসেন্স নবায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যক্রমেও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইনভিত্তিক সেবা বৃদ্ধির ফলে নাগরিকদের অফিসে উপস্থিতির প্রয়োজন কমছে এবং ভোগান্তিও হ্রাস পাচ্ছে।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মোমিন উদ্দিন বলেন, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনার কারণে জরুরি সরকারি নির্দেশনা দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প তদারকিতেও এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের ই-নথি ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অফিস পরিচালনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ই-ফাইলিং ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সব সরকারি দপ্তরে সমন্বিত ডেটা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্মসচিব জানান, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি এবং সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করে সরকারি অফিস ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সেবাপ্রাপ্তির সময় আরও কমবে এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে আধুনিক ও গতিশীল করে তুলছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তন নাগরিক সেবাকে সহজ করার পাশাপাশি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ই-ফাইলিং চালুর ফলে সেবাপ্রার্থীরা সরকারি সেবা গ্রহণে আগের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। একসময় একটি আবেদন জমা দেওয়া, ফাইলের অগ্রগতি জানা কিংবা অনুমোদন পেতে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হত। এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে অনেক সেবা ঘরে বসেই পাওয়া যাচ্ছে।

সময় সাশ্রয়ের মাধ্যমে সেবাপ্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছেন। অনলাইনে আবেদন জমা, নথি আপলোড এবং আবেদন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকায় বারবার সরকারি অফিসে যেতে হচ্ছে না। ফলে যাতায়াত খরচ ও কর্মঘণ্টার অপচয়ও কমেছে।

রাজশাহীর সেবাপ্রার্থী শারমিন আক্তার বলেন, ‘ই-ফাইলিংয়ের কারণে কাজের গতি বেড়েছে। আগে একটি ফাইল কোথায় আছে তা জানতে অনেক সময় লাগত, এখন কর্মকর্তারাও দ্রুত সাড়া দেন।’

দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর প্রতি নির্ভরতাও অনেকাংশে কমেছে। বিশেষ করে ভূমিসেবা, বিভিন্ন সনদ, লাইসেন্স নবায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আবেদন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে সরাসরি সেবা পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচের প্রবণতাও কমছে।

গ্রামীণ এলাকার সেবাপ্রার্থীরাও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সেবা সহজে গ্রহণ করতে পারছেন। এতে শহর-গ্রামের সেবাবৈষম্য কিছুটা হলেও কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আরও পড়ুন
dfff

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৩৮ অডিট রিপোর্ট হস্তান্তর

নারী, প্রবীণ ব্যক্তি ও কর্মজীবীদের জন্যও ই-ফাইলিং বড় সুবিধা তৈরি করেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো বা দিনের পর দিন অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন কমে যাওয়ায় তারা সহজে ও দ্রুত সেবা নিতে পারছেন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-ফাইলিং শুধু প্রশাসনিক গতি বাড়াচ্ছে না, এটি নাগরিকবান্ধব সেবা নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাব্যবস্থা যুক্ত হলে সরকারি সেবা আরও দ্রুত, সহজ ও কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

আরটিভি/এসএস