images

জাতীয়

ফরিদা খানম: মাতৃত্ব ও মেধার এক আপসহীন উপাখ্যান

রোববার, ১০ মে ২০২৬ , ০৭:৩৫ পিএম

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল পদমর্যাদার উজ্জ্বলতায় নয়, বরং ধৈর্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে পাহাড়সম দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে যেন খোদাই করে লেখা। এমনই এক লড়াকু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মা ফরিদা খানম। ঢাকার ইতিহাসে প্রথম নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিসিএস (প্রশাসন) ২৫তম ব্যাচের এই চৌকস কর্মকর্তা। একসঙ্গে সামলাচ্ছেন সন্তান-সংসার আর শহর। 

বিশ্ব মা দিবসে সফল এই মায়ের গল্পই আমাদের আজকের বিশেষ নিবেদন।

গোপালগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ফরিদা খানমের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি ছিল অত্যন্ত মজবুত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী এই শিক্ষার্থী ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বের গুণে ছিলেন ভাস্বর। ঐতিহ্যবাহী রোকেয়া হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ফরিদা খানম ছাত্রজীবন থেকেই গণতান্ত্রিক চেতনার একনিষ্ঠ ধারক। তবে, তার পেশাগত জীবনের পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অমসৃণ পথ পাড়ি দিতে দিতে হয়েছে অগ্নিপরীক্ষা। অসীম ধৈর্য দিয়ে দিয়েছেন সেই পথ পাড়ি। 

বঞ্চনার কণ্টকাকীর্ণ পথ ও অটল মেরুদণ্ড

প্রশাসনের অন্দরমহলে ফরিদা খানম এক আলোচিত নাম। তার অদম্য ধৈর্য সাহস আর সততার জন্য। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিজেই। আওয়ামী লীগ শাসনামলে গোপালগঞ্জ মানেই যেখানে ছিলো ক্ষমতার দাপট আর অর্থ উপার্জনের সহজ ব্যবস্থা, সেখানে নিজের জেলা গোপালগঞ্জ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়াতো দূরে থাক, বঞ্চনায় কেটেছে দিনগুলো। তবে, তৎকালীন সরকারের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে হাটতে পারলে সুযোগ ছিলো বলেও জানান ফরিদা খানম। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি বলে আরও বেশি বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে তাকে। নিজের আদর্শে অবিচল থাকায় দীর্ঘ সময় তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু, বঞ্চনা এই লড়াকু কর্মকর্তাকে দমাতে পারেনি, বরং তার সততার ধার বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।

ঢাকার ইতিহাসে প্রথম নারী ডিসি

সময়ের আবর্তে ফরিদা খানম তার যোগ্যতার যোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছেন। চট্টগ্রামে সফল জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে যোগদান করেন। বর্তমানে ঢাকার মতো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় প্রথম নারী ডিসি হিসেবে তার নিয়োগ বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি কেবল ফরিদা খানমের বিজয় নয়, বরং দেশের নারী নেতৃত্বের ক্ষমতায়নের এক নতুন দিগন্ত বলেই মনে করেন অনেকে। নিজের যোগ্যতার সবটুকু নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে চান এই জেলা প্রশাসক। সাফ্যলের স্বাক্ষর রাখতে চান চট্টগ্রামের মতো ঢাকাতেও। 

শাসনের আড়ালে এক স্নেহময়ী মা

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে থেকে কঠিন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া, জনসেবার চাপ আর বদলি—এই সবকিছুর মাঝেও ফরিদা খানমের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মা। এক পুত্রসন্তানের জননী ফরিদা খানম প্রমাণ করেছেন, বাইরে যতই প্রশাসনিক কঠোরতা থাকুক, মাতৃত্বের শীতল ছায়া সবসময়ই অটুট থাকে। 

পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং বৈষম্যের দিনগুলোতেও সন্তানের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। সহকর্মীদের মতে, প্রশাসনের ব্যস্ততম টেবিল থেকেও তিনি সন্তানের খবর নিতে ভুল করেন না। শাসনের দৃঢ়তা আর স্নেহের কোমলতা—এই দুইয়ের এক অনন্য ভারসাম্য তার জীবনে দৃশ্যমান।

মা দিবসের এক অনুপ্রেরণা

ফরিদা খানমের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি শক্ত মেরুদণ্ড আর স্থির লক্ষ্য থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারে না। মা দিবসে তার এই যাপিত জীবনে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের নবীন কর্মকর্তাদের জন্য যেমন অনুপ্রেরণা, তেমনি সাধারণ নারীদের জন্যও এক বিশাল বার্তা। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন মা যেমন মমতায় সংসার আগলে রাখেন, ঠিক তেমনি দক্ষ হাতে রাষ্ট্র ও সমাজকেও নেতৃত্ব দিতে পারেন।

ফরিদা খানমের গল্প তাই কেবল একজন সফল কর্মকর্তার নয়, এটি একজন লড়াকু মায়ের গল্প—যিনি প্রতিকূলতাকে জয় করে আজ সাফল্যের শিখরে। ফরিদা খানম এক লড়াকু প্রতিচ্ছবি, যিনি প্রমাণ করেছেন— বঞ্চনা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি তার লক্ষ্য থাকে স্থির আর মেরুদণ্ড থাকে শক্ত।

আরটিভি/এসএইচএম