সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ , ০৪:৫৪ পিএম
Failed to load the video
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বশান্তি রক্ষায় যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তা অনেকেই যথেষ্ট উপলব্ধি করেন না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ভালোবেসে ও দেশের সম্মান রক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
সোমবার (৮ জুলাই) দুপুরে সিরডাপ মিলনায়তনে 'বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদান' শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনা সভাটি আয়োজন করে ডিফেন্স জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিজাব)।
ডিজাব সভাপতি আলমগীর হোসেনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমডোর (অব.) এম এম জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এয়ার কমোডোর মোহাম্মদ মুশতাকুর রহমান (এলপিআর)। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন ডিজাবের সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম মাসুম।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী সদস্যরা যে ভূমিকা রাখেন, আমি আফ্রিকার দেশগুলোতে গিয়ে বিভিন্ন কনফারেন্সে দেখেছি আমার কাছে মনে হয়েছে, আমরা বাংলাদেশিরা সেটা যথেষ্ট উপলব্ধি করি না। তারা যে অর্জন করে আনেন, সেটা জীবনের চেয়েও বড় নয়। তারা জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন।
বিশ্ব শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া সদস্যদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি তাদের পরিবারের প্রতিও আজ স্মরণ করতে চাই। প্রত্যেকটি পরিবার তাদের বাবা, স্বামী, ভাইকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, তারা ফেরত আসবেন কি না, সেটা তারা জানেন না। কিন্তু সেই দেশপ্রেম থেকে, বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে তারা এই কাজটি করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের স্যালুট জানাই। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের স্যালুট জানাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবসময় বিষয়টি নিয়ে সচেষ্ট রয়েছে।
ভবিষ্যতেও শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা যেকোনো প্রয়োজনে আমাদের কাছে আসলে আমরা সেটি গুরুত্বের সঙ্গে নেব এবং আপনাদের সহযোগিতা করব।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ, কমোডর (অব.) এম এম জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া এবং এয়ার কমোডর মোহাম্মদ মুশতাকুর রহমান (এলপিআর)। তারা বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্য কেবল সামরিক দক্ষতার ফল নয়; বরং মানবিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্বের সমন্বিত প্রতিফলন।
বক্তারা আরও বলেন, সিয়েরা লিওনের পুনর্গঠনে বাংলাদেশের অবদান, হাইতিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসলিম নারী পুলিশ ইউনিট মোতায়েন, আফ্রিকায় স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সম্প্রতি জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ‘দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ অর্জন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিজাব) সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, অনেকের ধারণা রয়েছে শান্তিরক্ষা মিশনে গেলে শান্তিরক্ষী সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অর্থ পান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অর্থের বড় একটি অংশই বাংলাদেশ সরকার পেয়ে থাকে।
শান্তিরক্ষা মিশন এলাকা ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্ব পালন করা শান্তিরক্ষীরা অনেক সময় নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত থেকেও বঞ্চিত হন। দেশে জন্ম নেওয়া সন্তানকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয় না অনেকের। ভিডিও কলে সন্তানকে দেখে তারা নিজেদের সান্ত্বনা দেন। মা-বাবা কিংবা নিকট আত্মীয় মারা গেলেও অনেক সময় দেশে ফিরে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান না শান্তিরক্ষা মিশনে থাকা সদস্যরা।
তিনি আরও বলেন, শান্তিরক্ষীরা প্রতিদিন নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে তারা দেশের সম্মান ও বিশ্ব শান্তি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে দেশটি শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৩টি দেশে ৬৩টিরও বেশি মিশনে দুই লাখ ছয় হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি জানান, বর্তমানে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ৪ হাজার ২১২ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আত্মত্যাগের অনন্য নজির স্থাপন করে এ পর্যন্ত ১৭৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন।
অনুষ্ঠানে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুল্লাহ ইবনে জায়েদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান, ঢাবির শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী, ডিজাবের সাবেক সভাপতি আবুল খায়ের ও মামুনূর রশীদ, সংগঠনের সিনিয়র সদস্য মাসুদ করিম, ডিক্যাব'র সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েসসহ একাধিক গবেষক বক্তব্য রাখেন। তারা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান তুলে ধরে ভবিষ্যতেও এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারের নীতি-সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, জাতিসংঘের চলতি বছরের প্রতিপাদ্য ‘ইনভেস্ট ইন পিস’ বা ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ, দক্ষতা ও মানবিক উদ্যোগ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করছে।
অনুষ্ঠানর শুরুতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আত্মোৎসর্গকারী বাংলাদেশি শহিদ শান্তিরক্ষীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এ সময় শান্তিরক্ষীদের অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়।
এছাড়া সেমিনারে ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স সেকশনের প্রেস স্পেশালিস্ট মাহাদি আল হাসনাতসহ ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আরটিভি/এমএ