সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ , ০১:১০ পিএম
প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসুরক্ষা পণ্য টুথপেস্টেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত নমুনার ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রয়েছে।
বিষয়টিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তারা মান নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক লেবেলিং এবং বাজার তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এ গবেষণা পরিচালনা করে। দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে স্থানীয় ও আমদানিকৃত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। নমুনাগুলোর বিশ্লেষণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই) ল্যাবরেটরিতে। পাশাপাশি ২ হাজার ৭৬০ জনের ওপর ভোক্তা জরিপও পরিচালিত হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার ২২টিতে, ভিয়েতনামের দুটি নমুনার দুটিতেই, থাইল্যান্ডের একটি এবং ভারতের একটি নমুনায় এ ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেলে। এছাড়া ক্লোজআপ রেড হট, ক্লোজআপ মেনথল ফ্রেশ, কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা, সিগন্যাল গ্রিন টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট, হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টসহ আরও কয়েকটি পরিচিত ব্র্যান্ডেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে পরীক্ষিত আটটি নমুনায় কোনো শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে শিশুদের টুথপেস্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের জন্য বাজারজাত ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা ব্রাশ করার সময় তুলনামূলক বেশি টুথপেস্ট গিলে ফেলে, ফলে তাদের শরীরে এসব কণা প্রবেশের আশঙ্কাও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, টুথপেস্টের মূল উদ্দেশ্য দাঁত পরিষ্কার রাখা ও মুখের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো অপ্রয়োজনীয় উপাদান থাকলে তা উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, শিশুদের টুথপেস্টে এমন উপাদান থাকলে আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ পাওয়া পণ্যের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত এবং উৎপাদকদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা এখনো চলমান। মানুষের শরীরে এসব কণার উপস্থিতি বিভিন্ন গবেষণায় শনাক্ত হলেও শুধু টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকেই গুরুতর রোগ হয় এমন চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়াতে মানসম্মত পণ্য ব্যবহার এবং বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পরীক্ষিত কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমারের তথ্য উল্লেখ ছিল না। ইএসডিওর মতে, এতে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভোক্তা জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ জানান, তারা আগে কখনো মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে শোনেননি। আর মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ এ বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়, যা খালি চোখে দেখা যায় না। দাঁত ব্রাশের সময় এর একটি অংশ শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং বাকি অংশ পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে নদী-খাল ও সমুদ্রে গিয়ে পরিবেশ দূষণের কারণ হয়। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা আবার মানুষের শরীরেও ফিরে আসতে পারে।
তাদের পরামর্শ, টুথপেস্ট কেনার আগে উপাদানের তালিকা যাচাই করা, মানসম্মত ও পরীক্ষিত পণ্য ব্যবহার, শিশুদের ব্রাশ করার সময় অভিভাবকের তদারকি নিশ্চিত করা এবং বাজারে নিয়মিত মান পরীক্ষা ও বাধ্যতামূলক লেবেলিং চালু করা এখন সময়ের দাবি।
আরটিভি/এসকে