images

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র / দেশজুড়ে

ঢাকার উপকণ্ঠে ব্যাটারি পোড়ানো খোলা ভাট্টি : হুমকিতে মানুষ, প্রকৃতি 

সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ , ০২:০৩ পিএম

কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ভাঙা হচ্ছে পুরাতন ব্যাটারি, আর এ ব্যাটারি পুড়িয়েই তৈরি হচ্ছে সিসা। ঢাকা, সাভার, ধামরাই ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় এমন অসংখ্য অবৈধ খোলা ভাট্টি গড়ে উঠেছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধামরাই উপজেলার কালামপুর এলাকায় কামাল মজুমদারের বাগানবাড়িতে চারটি খোলা চুলায় সীসা গলানো হচ্ছে। এ ছাড়া সাভারের নামাবাজার এলাকার একটি পরিত্যক্ত ইটভাটায় দুটি চুলা, গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে ময়লা ডাম্পিংয়ের কাছে আটটি চুলা, আমিনবাজারের ময়লার ভাগাড় সংলগ্ন এলাকায় চারটি চুলা এবং সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের আওয়াল মার্কেটের দক্ষিণে একটি ইটভাটার ভেতরে আটটি চুলায় পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা গলানোর কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আভাস পেলেই এসব খোলা ভাট্টির মালিকরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করেন। তাদের দাবি, এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মালিক ও পৃষ্ঠপোষকদের পরিচয় পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অটোরিকশা ও চার্জারচালিত ভ্যানের ব্যবহৃত ব্যাটারি বাজারমূল্যের তুলনায় কম দামে কিনে আনা হয়। পরে ব্যাটারির এসিড আলাদা করে প্লাস্টিক ও সীসা পৃথক করা হয়। দিনের বেলায় ব্যাটারি ভাঙার কাজ চললেও রাতের আঁধারে খোলা চুলায় সীসা গলানো হয়।

এ সময় নির্গত কালো ধোঁয়া, বিষাক্ত গ্যাস ও ব্যাটারির এসিড আশপাশের পরিবেশ দূষিত করছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবহৃত এসিড উন্মুক্ত জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যা পরে ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয়দের দাবি, ধান, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন রোগবালাইও দেখা দিচ্ছে।

সাভারের ভাকুর্তা এলাকার তেভাগা কৃষক রমিজ উদ্দিন মিয়াসহ কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, রাতে ব্যাটারি পোড়ানোর সময় প্রায় কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এতে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একইসঙ্গে কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে খোলা ভাট্টির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। 

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যবিরোধী এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মানিকগঞ্জের মোহাম্মদ সোহেল চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি দাবি করেন, সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রাম ইউনিয়নের দাশেরহাটি এলাকাতেও একটি খোলা ভাট্টি রয়েছে।

রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ বাবুল অভিযোগ করেন, তুরাগ থানার কামারপাড়া এলাকায় ইস্টার্ন মেডিকেলের কাছেও একটি খোলা ভাট্টিতে ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা গলানো হচ্ছে, যা স্থানীয় পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, এটিপি (ATP) ও ইটিপি (ETP) সুবিধাসহ পুরোনো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের জন্য কয়েকটি অনুমোদিত কারখানাকে লাইসেন্স দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করলেও অবৈধ খোলা ভাট্টির ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের রাজস্ব পরিশোধ না করে উন্মুক্ত পরিবেশে সীসা উৎপাদন করছেন।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন অবিলম্বে অবৈধ খোলা ভাট্টি বন্ধের দাবি জানিয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) সৈয়দ আহম্মদ কবীর বলেন, সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়গুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম সক্রিয় করা হচ্ছে, যাতে অবৈধ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) মো. ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, অবৈধভাবে কোনো সীসা কারখানা পরিচালনার সুযোগ নেই। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গাজীপুর ও ঢাকা জেলার আশপাশে কোথাও অবৈধ সীসা কারখানা পরিচালিত হলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরটিভি/এসকে