বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ , ০১:৩৪ পিএম
গাজীপুর সিটি করপোরেশন ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ করছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণকে ঘিরে পরিবেশবিদ, বন বিভাগ ও আইনবিদদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বন বিভাগের দাবি, এই কেন্দ্র চালু হলে বন, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম সংরক্ষিত শালবন। প্রায় ৫ হাজার ২২ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই বন হরিণ, বুনো শূকর, বেজি, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের আবাসস্থল। একই সঙ্গে এটি ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, গত বছরের মার্চে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি বর্জ্যবাহী গাড়িকে বনের ভেতরে বর্জ্য ফেলতে গিয়ে আটক করা হয়েছিল। তখন আর এমন কাজ না করার লিখিত অঙ্গীকার দেওয়া হলেও পরে আবারও একই ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়।
চলতি বছরের ১১ এপ্রিল গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নিয়োগ দেওয়া শ্রমিকরা বনের সীমানাপ্রাচীরের কাছে নির্মাণকাজ শুরু করেন। বন কর্মকর্তারা অনুমোদনের কাগজপত্র চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। এরপরও কাজ চলতে থাকে।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পরদিন রাতে যন্ত্র দিয়ে বনের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। পরে বন বিভাগ নির্মাণকাজ বন্ধের চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে যৌথ পরিদর্শনে সংরক্ষিত বনের একটি অংশে আগুন লাগানোর ঘটনাও ধরা পড়ে।
বন বিভাগের দাবি, এই প্রকল্পের জন্য বন বিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক, প্রধান বন সংরক্ষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লিখিতভাবে জানানো হলেও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি।
বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রের উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। এটি চালু হলে একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার টন বর্জ্য রাখা যাবে বলে জানা গেছে।
এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বিষয়টি উচ্চ আদালতে নিয়ে যায়। আদালত গত ৪ মে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে সব ধরনের নির্মাণকাজ এবং আগামী ছয় মাস সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও জাতীয় উদ্যানের ভেতরে হওয়ায় এর ব্যবহার আইনের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। তাই সেখানে বর্জ্য কেন্দ্র নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা খানম বলেন, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই নতুন বর্জ্য কেন্দ্র নির্মাণে তারা সমস্যায় পড়ছেন।
এ বিষয়ে ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, জাতীয় উদ্যানের ভেতরে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গৃহস্থালি ও পোল্ট্রির বর্জ্য নিয়মিত ফেলা হলে পরিবেশ ও বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হবে। বন্যপ্রাণী এসব বর্জ্য খেয়ে অসুস্থ হবে, এমনকি মারা যেতে পারে। এটি বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি।
তিনি আরও বলেন, গভীর নলকূপ স্থাপনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যেতে পারে, যা শালবনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করবে। বন বিভাগের আশঙ্কা, বর্জ্য কেন্দ্র চালু হলে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের বাস্তুসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আরটিভি/জেএমএ