বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ ২০২৩ , ০৪:০৪ পিএম
‘গুটি খেলা’ গ্রাম বাংলার একটি জনপ্রিয় খেলা। ৫টি সমান আকারের পাথর খণ্ড নিয়ে এটা খেলতে হয়। গ্রামে জন্মানো প্রায় প্রতিটি ছেলেমেয়েই গুটি খেলতে খেলতে বড় হয়।
এটা গেল গুটির অ্যাথলেটিক টার্ম। শব্দটার ভীষণ নেতিবাচক মানেও আছে। ‘গুটি চালা’ বলে বাংলায় যে কথাটি প্রচলিত, তার সোজা মানে— ষড়যন্ত্র করা।
এর বাইরে গুটি শব্দটার সাম্প্রতিক এক অর্থ তরুণদের মধ্যে প্রচলিত এবং জনপ্রিয়। তাদের কাছে ‘গুটি’ মানে— ইয়াবা। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের পরই ইয়াবা নামের ড্রাগটি ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যদ্দুর জানি, এই সোনার বাংলার এমন কোনো গ্রাম বাকি নেই, যেখানে তরুণেরা ইয়াবা সেবন করেন না।
কখন, কিভাবে এবং কেন ইয়াবার নাম ‘গুটি’ হয়ে গেল, তা বলতে পারি না। তবে ইয়াবা আসক্তদের মুখে মুখে নামটা ঘুরে বেড়াতে দেখি।
দেশে ইয়াবা প্রবেশের জনপ্রিয় রুট হচ্ছে টেকনাফ। নাফ নদীর ওপারেই মিয়ানমার। এপারে টেকনাফ। সুতরাং ইয়াবা আনতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।

গত ৯ মার্চ সহকর্মী সাংবাদিককে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম সেন্ট মার্টিন। ঢাকা থেকে রাতের বাসগুলো ছেড়ে টেকনাফের জেটিঘাটে পৌঁছায় পরদিন সকালবেলা। বাস থেকে পা নামাতেই স্থানীয় কিশোরের দল রীতিমতো ঘিরে ধরে।
‘মামা কী লাগবে?’
ব্যাপারটা ঠিক মামা-বাড়ির আবদারের মতো। কিশোরদের ভাষ্য, যা চাইবেন তা-ই পাবেন।
শুরু হয় মদ-বিয়ারের অফার দিয়ে।
বললাম— লাগবে না।
গাঞ্জা লাগবে?
বললাম— না।
গুটি লাগবে মামা, গুটি? একদম অরিজিনাল। ঢাকায় এই গুটি পাবেন না। গ্যারান্টি!
কিশোরের ‘গ্যারান্টি’ শুনে মনে হবে— আপনাকে সুন্দরবনের মধু কেনার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে।
সকালবেলা শত শত পর্যটক টেকনাফের জেটিঘাটে বাস থেকে নামেন। প্রায় সবারই একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কিশোরেরা বেপরোয়া। পরিবার, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সেন্ট মার্টিন যাচ্ছেন, এমন পর্যটকদেরও গুটির প্রস্তাব দেয়া হয়।
এই প্রস্তাবে কোনো রাক-ঢাক নেই। অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ সদস্যরা। সকালবেলার আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে তারা চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। আর ঝাঁকে ঝাঁকে কিশোরেরা ইয়াবা বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে ঘুরছে পর্যটকদের পেছনে।
এই কিশোরদের আচরণ দেখে মনে হয়— পুলিশের সঙ্গে তাদের কোনো সমঝোতা আছে। একজনকে জিজ্ঞেস কলাম— এই যে গুটি গুটি করে চিল্লাচ্ছো, পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ সদস্য, ভয় পাও না?
কিশোর ঠোঁট উলে্ট বলল— পুলিশকে ভয় পাওয়ার কী আছে?
বটে! পুলিশ হলো জনগণের বন্ধু। তাকে ভয় পাওয়ার কিছু নাই বুঝতে পেরে জাহাজের দিকে পা বাড়ালাম আমরা। দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ আমাদের জাহাজ ভিড়লো সেন্ট মার্টিনে।
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। প্রকারান্তরে দেশের একমাত্র দ্বীপই বলা চলে। দেশের দক্ষিনাঞ্চলজুড়ে বিচ্ছিন্ন কিছু দ্বীপের অস্তিত্ব থাকলেও সেন্ট মার্টিন অনন্য।
অনন্য দুই কারণে। এক. উপকূল থেকে এত গভীরে বাংলাদেশের আর কোনো দ্বীপ নেই। দুই. দ্বীপটি প্রবাল দ্বারা গঠিত।
সঙ্গত কারণেই পর্যটক মৌসুমে এখানে মানুষের ঢল নামে। নীল জলরাশির ভেতর মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপের অপার সৌন্দর্য সমুদ্রবিলাসীদের টেনে আনে।
সেন্ট মার্টিনে আগেও কয়েকবার গিয়েছি। প্রতিবারই আগেরবারের চেয়ে বেশি জঞ্জালময় মনে হয়েছে সেন্ট মার্টিনকে। এবার দ্বীপটিতে পা রেখেই মনে হলো— সেন্ট মার্টিন যেন অনিয়মের স্বর্গরাজ্য।
আগে সেন্ট মার্টিনে বিদ্যুত ব্যবস্থা ছিল না। সঙ্গত কারণেই ‘অটো’ নামের ত্রি-চক্রযানের যন্ত্রনাও ছিল না। দ্বীপটি লম্বায় ৬ কিলোমিটার। প্রস্থে আধা কিলোমিটারের মত। এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে যেতে সময় লাগে সাকুল্যে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট।
কী কারণে এখানে অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেল চলে, তা আমার ছোট মাথায় ধরে না। কতৃপক্ষ এমন একটি ছোট্ট দ্বীপে এসব জঞ্জাল চলাচলের অনুমতি কেন দেন, তা বুঝতে পারার মতো উর্বর মস্তিষ্কও আমার নেই।
জাহাজ যখন সেন্ট মার্টিনে নোঙর করে, তখন একসঙ্গে কয়েক হাজার পর্যটক সেখানে পা রাখেন। পর্যটন মৌসুমে টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ১১টি জাহাজে দিনে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যান। স্থানীয় মানুষের সংখ্যাও কম নয়, প্রায় সাড়ে সাত হাজার।
মাত্র আট বর্গকিলোমিটার একটা দ্বীপে একসঙ্গে দশ-বারো হাজার মানুষ যদি পা রাখেন, নড়াচড়ার জায়গা কি থাকে?
তার ওপর আছে অটোরিকশার যন্ত্রনা। সব মিলিয়ে ভয়াবহ এবং বিরক্তিকর এক দ্বীপে পরিণত হয়েছে সেন্ট মার্টিন।

এবার আসুন বীচে যাই। চারপাশ থেকে নীল জলরাশির ঢেউয়ে চড়ে যে বাতাস প্রবাহিত হয়, তা গায়ে মাখতে যখন বীচে যাবেন তখন বিষ্ময়ের সীমা থাকবে না।
যত্রতত্র মানুষের মল, প্লাসি্টকের বোতল, চিপস এর প্যাকেট। এ যেন মগের মুলুগ। যার যেমন খুশি চলছে। দ্বীপটিতে যেন নেই কোনো প্রশাসন, নেই আইন-কানুনের বালাই।
এরপর ক্ষুধা লাগলে রেস্টুরেন্ট খুঁজবেন। পেয়েও যাবেন হাতের কাছেই। কী দেখবেন সেখানে? কোটি কোটি মাছি ভনভন করছে সাজিয়ে রাখা রূপচাঁদা, স্যালমনের গায়ে। রেস্টুরেন্টগুলো মাছি উত্পাদনের কারখানা। প্রতিটি রেস্টুরেন্ট-ই। এর কারণ, নোংরা পরিবেশ। সেন্ট মার্টিনের প্রতিটি বর্গ ইঞ্চি নোংরা করে রেখেছেন পর্যটক এবং স্থানীয়রা মিলে।
দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) একটি— সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। মানে হলো, এ দ্বীপের পানি, মাটি, বায়ু বা প্রাণীর ক্ষতি করে, এমন কোনো কাজ সেখানে করা যাবে না। এ কারণে সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণে ছাড়পত্র দেয় না পরিবেশ অধিদপ্তর।
সেন্ট মার্টিনে প্রবাল, শৈবাল, কাছিম, শামুক, ঝিনুক ও কড়ি, সামুদ্রিক মাছ, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, কাঁকড়াসহ ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের গমন ও পরিবেশদূষণের কারণে দ্বীপটি সংকটাপন্ন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে।
সেন্ট মার্টিনে হোটেল-রিসোর্ট-রেস্টুরেন্টের সংখ্যা কত জানেন? ২৩০টি।
একবার ভাবুন তো, আট বর্গকিলোমিটার একটা দ্বীপে ২৩০টি স্থাপনা। স্থানীয়দের ঘরবাড়ি এই হিসেবের বাইরে। কী, ভাবতে গিয়ে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসছে না?
এই প্রবাল দ্বীপটিতে বহুতল ভবন নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুনতে ভালো লাগছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— কমপক্ষে ৪০টি ভবন বহুতল।
কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই— ব্যাপারটা এমন। এখানে উলে্টা। গরু কেতাবে নেই কিন্তু গোয়ালে আছে।
এ ব্যাপারে তদারকির দায়িত্ব যাদের, তাদের কারো কাছে জানতে চান, দেখবেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। তারা বলবেন— তাই নাকি! জানতাম না তো!
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ঠেকানোর কাজটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে দ্বীপটিকে রক্ষার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের।
কক্সবাজারে জেলা প্রশাসন ও টেকনাফে উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় রয়েছে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপেই পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি কার্যালয় আছে, পুলিশ ফাঁড়ি আছে।
অবৈধ স্থাপনা যত বাড়ছে, সেন্টমার্টিনে ‘গুটি’র প্রতাপও ততো বাড়ছে। যারা ভেবেছিলেন টেকনাফের জেটি ঘাটেই গুটি সংক্রান্ত বিষয় শেষ, তাদের জন্য বিশেষ খবর হলো— গুটির দৌরাত্ব সেন্টমার্টিনেও আছে।
অনুমতিহীন বহুতল হোটেল ‘ড্রিমারস প্যারাডাইস’ এর সামনে আমরা হাঁটছিলাম। রাত ১০টা হবে। এক উঠতি তরুণ পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলল— গুটি লাগবে মামা?

তরুণ নিজেকে পরিচয় দিল ‘ড্রিমারস প্যারাডাইস’ এর স্টাফ। ইয়াবা বিক্রির অনুমতি কে দিল— এমন প্রশ্নের উত্তরে খেপে গেল তরুণ। জানালো, ঢাকার সরকারি তেজগাঁও কলেজের সাবেক এক প্রিন্সিপাল এই হোটেলের মালিক। তার অনেক ক্ষমতা। তাই কোনো ‘অবান্তর’ প্রশ্ন করা যাবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বিক্রির জন্য কিশোর-কিশোরীদের হাতে ইয়াবা তুলে দিয়েছেন মাদক ব্যবসায়িরা। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা মাদক বিক্রি করলে ঝুঁকি কম। পুলিশের হাতে পড়ে গেলেও ‘বাচ্চা ছেলে মাফ করে দেন’ বলে পার পাওয়া যায়। সে কারণেই ‘গুটি’ বিক্রির জন্য এসব কোমলমতি শিশুদের ব্যবহার করা হয়।
অনন্য সেন্ট মার্টিন রক্ষায় প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলরা যেমন উদাসীন, তার চেয়েও বেশি উদাসীন এখানে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা। এই দ্বীপটি নোংরা, আবর্জনাময় হয়ে ওঠার পেছনে অসচেতন পর্যটকেরাই বেশি দায়ী। আরেকটা আপদ আছে, প্রবালের টুকরো কিনে আনা।
স্থানীয় কিশোর-কিশোরীরা তাজা প্রবাল তুলে এনে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করছে দেদারসে। এটা ওপেন-সিক্রেট। অথচ প্রবাল খোঁড়া, কেনা-বেচা করা বেআইনি।
অনেক পর্যটক জানেন-ই না হয়তো, প্রবাল কোনো জড় বস্তু না। আক্ষরিক অর্থেই এটি জীব। এর জীবন আছে। স্থুল অর্থে যদি বলি, প্রবাল একটি প্রাণী। বংশ বিস্তারও করে। এই প্রবালের প্রাচীর তৈরি হতে সময় নেয় লক্ষ লক্ষ বছর। অথচ কী নিমিষেই তা খুঁড়ে এনে আমরা বিক্রি করছি এবং কিনে এনে ড্রইং রুমে সাজিয়ে রাখছি।

এক গবেষণায় জানা গেছে, ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩৮ বছরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রবাল প্রজাতি ১৪১টি থেকে কমে ৪০টিতে নেমেছে। আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হতে পারে।
দুই রাত থেকে যখন আমরা জাহাজে চেপে সেন্ট মার্টিন থেকে ফিরছিলাম, পেছনে চেয়ে দ্বীপটির অসহায় মুখটাই অনুভব হলো।
কী নির্মমতায় প্রকৃতির এই দান আমরা ক্ষত-বিক্ষত করছি! কী নিষ্ঠুরতায় আমরা নিজেদের পায়েই কুড়াল মারছি!
সোহেল অটল: সাংবাদিক ও লেখক
atol.bd@gmail.com