মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৬:৩৮ পিএম
কৈশোরে খেলার মাঠে ধুলোবালি মেখে বন্ধুদের সাথে মেতে থাকতেন যে মেয়েটি, একদিন এক অজ্ঞাতনামা দরবেশের ছোট্ট একটি কথা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। দিনাজপুর শহরের সেই সাধারণ কিশোরী খালেদা খানম পুতুলকে কাছে ডেকে দরবেশ বলেছিলেন, ‘মা তুই একজন ভাগ্যবতী মেয়ে, একদিন তুই রাজরানী হবি।’ সেই অদেখা দরবেশের কথা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হবে, তা সেদিন কেউ কল্পনাও করেনি। আজ সেই ‘রাজরানী’ ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে তার শৈশব-কৈশরের স্মৃতিবিজড়িত দিনাজপুর জেলা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় ইস্কান্দর মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদার দম্পতির ঘরে জন্ম নেন পুতুল। শহরের অলিগলি আর দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বারান্দায় কেটেছে তার দুরন্ত শৈশব। তার খেলার সাথি ৭৬ বছর বয়সি কামরুন নাহার বেগম আজ চোখের জলে স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা একসাথে স্কুলে যেতাম, খেলাধুলা করতাম। সেই দরবেশের কথা আজও কানে বাজে। সেদিন তিনি হঠাৎ এসে পুতুল আপাকে ওই কথা বলে চলে গিয়েছিলেন, আর দেখা মেলেনি তার। কিন্তু আপা ঠিকই একদিন দেশের ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠেছিলেন।
দিনাজপুরের মিশন রোডের বাসিন্দা ও সহপাঠী ঊষারাণী শীল স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ছোটবেলা থেকেই পুতুল ছিল অনন্য সুন্দরী ও নিরহংকার। স্কুলে সবার সাথে হাসি-খুশি মেলামেশা করত। সে সময়ের সবচেয়ে সুন্দরী ছাত্রী হিসেবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রিয় মুখ ছিল সে। ১৯৬০ সালে এসএসসি পাসের পর ওই বছরই জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে তার জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়। স্বামীর হাত ধরে ‘রাজরানী’র সেই ভবিষ্যৎবাণী পূরণ হলেও সময়ের প্রয়োজনে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন রাজ্য পরিচালক ও আপসহীন নেত্রী।
দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ি এলাকায় অবস্থিত ‘তৈয়বা ভিলা’ আজ এক বিশাল স্মৃতির ভাণ্ডার। ভবনটি বর্তমানে ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও দ্বিতীয় তলায় খালেদা জিয়া ও তার বাবা-মায়ের কক্ষগুলো আজও সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কক্ষগুলো দেখাশোনা করা বৃদ্ধা কারিনা বেওয়া আজ বাকরুদ্ধ। প্রতিবেশী ৭৮ বছর বয়সি মোস্তা হাসানুর আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, পুতুল আপা আমাদের বড় বোনের মতো ছিলেন। তার বাবা-মা আমাদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। আজ আপার চলে যাওয়ার খবর শুনে মনে হচ্ছে নিজের পরিবারের কাউকে হারালাম।
দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা নাজমা ইয়াসমিন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া এই স্কুলের গর্বিত শিক্ষার্থী ছিলেন, যা আমাদের চিরকাল অনুপ্রেরণা দেবে। ১৯৫৪ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিদায় নিলেন। দিনাজপুরের আকাশ-বাতাস আজ কেবল এক সময়ের সেই ‘পুতুল আপা’র স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত।
আরটিভি/এআর