শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ , ০১:০২ পিএম
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই মুহূর্তে নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থানে আছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ অবস্থায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়েছে কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল জাজিরা।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আল জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’ শিরোনামে প্রচারিত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। সাক্ষাৎকারের ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর এবং জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমিরের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা, ইসলামিক আইন চালুর বিষয়ে দলের অবস্থান, নারী নেতৃত্ব, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান আল জাজিরার সাংবাদিক।
এর মধ্যে নারীদের নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির জানান, এবারের নির্বাচনে তাদের দল থেকে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া না হলেও তারা এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জামায়াতের প্রধান পদে নারী আসতে পারেন কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্ভব নয়।’ এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবে না বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে নারীদের সীমাবদ্ধতা আছে, তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিছু শারীরিক অসুবিধা আছে, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তিনি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন? এটি সম্ভব নয়।’
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশে ইসলামি আইন চালু করা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি দেশের মঙ্গলের জন্য এটি অপরিহার্য হয়, তবে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি আমি নই, সংসদই বিষয়টি স্থির করবে।’
সাক্ষাৎকারে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশিদের ওপর চালানো নৃশংসতার ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। জামায়াত আমির বলেন, ‘তৎকালীন জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের নেতারা মনে করেছিলেন ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সেটি বাংলাদেশের ওপর ভারতের আরেকটি আধিপত্য তৈরি করবে।’
এ পর্যায়ে জামায়াত–সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ আছে বলে উল্লেখ করেন আল জাজিরার সাংবাদিক। তার জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সেই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, কোনো সংগঠনের দ্বারা নয়। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তবে স্বাধীনতার পর কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয়নি? শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন, যারা সবাই ছিল পাকিস্তানি সেনা; এই ভূখণ্ডের কেউ নয়।’
এ সময় দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াতে ইসলামীর যুক্ত থাকার অভিযোগও অস্বীকার করেন দলটির আমির। এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের কেউ কখনো এ ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে যা-ই ঘটেছে, তারা জামায়াতকে দায়ী করেছে, কিন্তু আদালতে একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি।’
এক পর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বিভিন্ন হামলা নিয়ে জাতিসংঘ যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। জামায়াত আমির বলেন, ‘আগস্টের অভ্যুত্থানের পরের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টটিও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলো সব মিথ্যা অপপ্রচার।’
আল-জাজিরার সাংবাদিক শফিকুর রহমানের কাছে জানতে চান, জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন নেতা দুটি সংবাদমাধ্যম এবং উদীচী ও ছায়ানটের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান কী?
জবাবে জামায়াত আমির বলেন, আমরা এটা সমর্থন করি না, আমরা এর নিন্দা জানিয়েছি। ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের কোনো অঙ্গসংগঠন নয়; এটি জামায়াতের আইনি কাঠামোর অংশ নয়। মানুষ ভুল করতে পারে, তাকে সংশোধন করতে হবে। যদি তারা এটি পুনরায় করে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় তরুণ প্রজন্ম জামায়াতকে গ্রহণ করবে বলে আশা প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে শিক্ষার্থীরা আমাদের ছাত্রসংগঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, তরুণদের মর্যাদা ও অধিকার আমাদের মাধ্যমেই রক্ষিত হবে।’
ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলে জামায়াত কী করবে, সে প্রশ্নে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা ভারতের সাথে ফলপ্রসূ সংলাপ করব। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, আমরা প্রতিবেশীদের কোনো অস্বস্তিতে ফেলব না এবং বিনিময়ে তাদের কাছ থেকেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আশা করি।’
আরটিভি/এসএইচএম