সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ , ০২:১৭ পিএম
ওয়ারস্বের আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো নরম হয়ে নেমে এসেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা প্যালেস অব কালচার অ্যান্ড সায়েন্সের আলোকোজ্জ্বল প্রাঙ্গণে একে একে জড়ো হচ্ছেন নানা দেশের কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, প্রবাসী বাংলাদেশি। দূর দেশেও যেন হঠাৎ করে জেগে উঠেছে বাংলাদেশের স্পন্দন— একটা পতাকা, একটা ইতিহাস, আর এক অদম্য আত্মত্যাগের গল্প।
এই আবহেই যথাযথ ভাব-গাম্ভীর্য ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে গত ২৬ মার্চ ওয়ারস্বতে উদযাপিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস।
দিবসের সূচনা হয় দূতাবাস প্রাঙ্গণে। পোল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. ময়নুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন। এ সময় উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক গভীর আবেগ— দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও যেন সবাই এক সুতায় বাঁধা।
দিনের দ্বিতীয় পর্বে আয়োজন করা হয় এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঐতিহ্যবাহী প্যালেস অব কালচার অ্যান্ড সায়েন্স। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি অব স্টেট ভ্লাদিস্লাভ বারতোশেভস্কি। পাশাপাশি পোল্যান্ড সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন এই আয়োজনে।
স্বাগত বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মো. ময়নুল ইসলাম জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি স্মরণ করেন সেই ত্যাগ, যার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। একই সঙ্গে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, তার স্বাধীনতার ঘোষণা বিভ্রান্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল।
রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির আলোকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশ ও পোল্যান্ডের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন, যা ১৯৭২ সালে পোল্যান্ডের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথি ভ্লাদিস্লাভ বারতোশেভস্কি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। রাষ্ট্রদূত তাদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, পোল্যান্ডে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
সবশেষে, সন্ধ্যার আয়োজনে অতিথিরা উপভোগ করেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। দূর দেশে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে যেন সবাই একসঙ্গে অনুভব করেছেন— বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, এটি এক অনুভূতি, এক গর্ব, এক পরিচয়।
আরটিভি/এমএইচজে