images

ধর্ম

আয়কর ও জমির খাজনা দিলে কি যাকাত মাফ হয়ে যায়?

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ , ০৯:০১ এএম

বর্তমান সময়ে অনেক মুসলমানের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয় সরকারকে আয়কর দিচ্ছি, জমির খাজনা দিচ্ছি, তাহলে কি আবার আলাদা করে যাকাত দিতে হবে? কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রকে দেওয়া এসব আর্থিক দায়ই হয়তো যাকাতের বিকল্প। তবে ইসলামি শরিয়তের আলোকে আয়কর, খাজনা ও যাকাত তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

ইসলামি স্কলারদের মতে, যাকাত একটি স্বতন্ত্র ফরজ ইবাদত। এটি শুধু আর্থিক দায়িত্ব নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া ও সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ বিধান। তাই আয়কর বা জমির খাজনা দিলেই যাকাতের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না।

যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর এবং জাকাত আদায় কর। (সুরা আল-বাকারাহ: ৪৩)

আরও বলা হয়েছে, তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন। (সুরা আত-তাওবা: ১০৩)

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এ আয়াতগুলো প্রমাণ করে যাকাত কেবল অর্থ লেনদেন নয়; এটি আত্মশুদ্ধিরও একটি মাধ্যম।

বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, আয়কর হলো রাষ্ট্র পরিচালনা, অবকাঠামো, প্রশাসন ও জনকল্যাণের জন্য সরকারের আরোপিত আর্থিক দায়। অন্যদিকে যাকাত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ ইবাদত, যা নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হয়।

কুরআনে যাকাতের খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,  নিশ্চয়ই সদকাসমূহ (জাকাত) হলো ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য।
(সুরা আত-তাওবা: ৬০)

এ কারণে যাকাতের অর্থ রাষ্ট্র বা ব্যক্তি ইচ্ছামতো অন্য খাতে ব্যবহার করতে পারে না। আলেমদের মতে, জমির খাজনা বা ভূমি কর দেওয়া একটি নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু এটি যাকাতের বিকল্প নয়। কারণ, 

* খাজনা রাষ্ট্রীয় আইনভিত্তিক দায়
* জাকাত শরিয়ত নির্ধারিত ফরজ ইবাদত
* উভয়ের উদ্দেশ্য, নিয়ত ও খাত ভিন্ন। 

তাই কারও ওপর যাকাত ফরজ হলে, খাজনা বা কর দেওয়ার পরও তাকে যাকাত আদায় করতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল এ সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, হজ পালন করা এবং রমজানের রোজা রাখা। (সহিহ বুখারি: ৮, সহিহ মুসলিম: ১৬)

আরেক হাদিসে এসেছে, সদকা (যাকাত) সম্পদ কমায় না। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)

প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফকিহদের বক্তব্যও একই ধরনের। ইমাম কাসানি বলেন, যাকাত আল্লাহর নির্ধারিত ইবাদত। তাই অন্য কোনো আর্থিক ব্যয় দ্বারা এর দায়িত্ব আদায় হবে না।

ইমাম নববি বলেন, যাকাতের নিয়ত ছাড়া অন্য কোনো খাতে অর্থ ব্যয় করলে তা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না।

মুফতি তাকি উসমানি বলেন, সরকারি ট্যাক্স বা ইনকাম ট্যাক্স যাকাতের বিকল্প নয়। কারণ যাকাত নির্দিষ্ট খাতে ও নির্দিষ্ট নিয়তে আদায় করতে হয়।

ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের এক ফতোয়ায়ও বলা হয়েছে, আয়কর রাষ্ট্রের হক, আর যাকাত আল্লাহর হক দুটিকে এক মনে করা যাবে না।

আলেমদের মতে, সাধারণভাবে সরকারি আয়করকে যাকাত হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কারণ, 
* যাকাতের জন্য নিয়ত জরুরি
* নির্দিষ্ট হকদারদের কাছে পৌঁছানো জরুরি
* সরকারি কর বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়
* যাকাত একটি ইবাদত, ট্যাক্স নাগরিক দায়িত্ব।

তবে কোনো ইসলামি রাষ্ট্র শরিয়ত অনুযায়ী যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করলে আলাদা বিধান হতে পারে বলে মত দিয়েছেন কিছু ফকিহ।

ইসলামে যাকাত শুধু অর্থনৈতিক বিধান নয়; এটি ঈমান ও ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই আয়কর, ভ্যাট, খাজনা বা অন্য কোনো সরকারি কর পরিশোধ করলেও, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানের ওপর যাকাত ফরজ থাকলে তাকে আলাদাভাবে যাকাত আদায় করতে হবে।

ইসলামি শিক্ষায় বলা হয়েছে, যথাযথভাবে যাকাত আদায় করলে সম্পদে বরকত আসে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

আরটিভি/এসকে