শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ , ০১:৩৬ পিএম
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ঝড় ও বজ্রপাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও জীবিকার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এমন কঠিন সময়ে একজন মুসলমানের করণীয় কী—এ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, সবই মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার অধীন। তাই কোনো দুর্যোগকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারণ ও পরীক্ষার অংশ হিসেবেও দেখা উচিত।
মহান আল্লাহ বলেন—
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
অর্থ: "পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের ওপর যে বিপদই আসে, তা আমি সৃষ্টি করার আগেই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।"
(সুরা আল-হাদিদ, আয়াত: ২২)
দুর্যোগ মুমিনের জন্য পরীক্ষা
আল্লাহ তাআলা কখনো ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও জীবনের ক্ষতির মাধ্যমে বান্দার ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা নেন।
তিনি বলেন—
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
অর্থ: "আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।"
(সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
কখনো সতর্কবার্তা, কখনো শিক্ষা
কোরআনে এসেছে, মানুষের গুনাহ ও অন্যায়ের কারণেও পৃথিবীতে নানা বিপর্যয় দেখা দেয়, যাতে মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
আল্লাহ বলেন—
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ
অর্থ: "স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে আল্লাহ তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান; হয়তো তারা ফিরে আসবে।"
(সুরা আর-রূম, আয়াত: ৪১)
তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যা বা দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বলা ঠিক নয়। এর প্রকৃত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।
বৃষ্টি আল্লাহর রহমত
কোরআনে বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত বলা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
وَهُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ الْغَيْثَ مِنْ بَعْدِ مَا قَنَطُوا وَيَنْشُرُ رَحْمَتَهُ
অর্থ: "তিনিই মানুষের নিরাশ হওয়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন।"
(সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ২৮)
বৃষ্টি হলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দোয়া পড়তেন—
اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا
অর্থ: "হে আল্লাহ! এই বৃষ্টিকে উপকারী বৃষ্টি বানিয়ে দিন।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৩২)
দুর্যোগের সময় মুসলমানের করণীয়:
ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসা
বিপদে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ বলেন—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
অর্থ: "নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তাঁরই কাছে ফিরে যাব।"
(সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৬)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"মুমিনের প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুখে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, আর দুঃখে ধৈর্য ধারণ করে—উভয় অবস্থাতেই তার কল্যাণ হয়।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
ঝড়-তুফানের সময় যে দোয়া পড়বেন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবল বাতাসের সময় পড়তেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এই বাতাসের কল্যাণ, এর মধ্যে থাকা কল্যাণ এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ চাই। আর এর অকল্যাণ, এর মধ্যে থাকা অকল্যাণ এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার অকল্যাণ থেকে আপনার আশ্রয় চাই।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৯)
অতিবৃষ্টিতে যে দোয়া পড়তেন
অতিরিক্ত বৃষ্টিতে কষ্ট হলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়তেন—
اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالظِّرَابِ وَبُطُونِ الْأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাদের ওপর নয়, আমাদের চারপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন। পাহাড়, টিলা, উপত্যকা ও গাছপালা জন্মায় এমন স্থানে বৃষ্টি দিন।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯৭)
গুজব থেকে দূরে থাকার নির্দেশ
দুর্যোগের সময় ভুয়া খবর বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।
আল্লাহ বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
অর্থ: "হে ঈমানদারগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও।"
(সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)
সতর্কতা গ্রহণও সুন্নত
ইসলাম শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলেনি, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিতে বলেছে। তাই বন্যার আশঙ্কা দেখা দিলে নিরাপদ স্থানে যাওয়া, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জরুরি জিনিসপত্র প্রস্তুত রাখা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
"প্রথমে উটটি বেঁধে রাখ, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা কর।"
(জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)
দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো বড় ইবাদত
বন্যাকবলিত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি দুনিয়াবি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
রাষ্ট্রের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ
ইসলাম শাসকদের ওপরও মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। তাই নদী ও খাল খনন, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক জনগণের অভিভাবক, আর তাকে তার জনগণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯)
বন্যা, ঝড় ও অতিবৃষ্টি একজন মুসলমানের জন্য ধৈর্য, দোয়া, তাওবা এবং আল্লাহর ওপর ভরসার সময়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ, গুজব থেকে দূরে থাকা এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে চললে দুর্যোগের সময়ও একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ লাভ করতে পারেন।
আরটিভি/জেএমএ