বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৭:০৮ পিএম
সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক ও মৎস্যজীবীরা। পরিবেশ সংক্রান্ত পত্রিকা ‘ডাউন টু আর্থ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর একই সময়ের তুলনায় এই বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ১৮৪ শতাংশ বেড়েছে।
পশ্চিমবঙ্গেও একদিনে প্রায় ২০ জন নিহত হয়েছেন, যারা প্রায় সবাই কৃষক। এই মারাত্মক সমস্যা সমাধানের জন্য এক অভিনব ও সাশ্রয়ী পথ দেখিয়েছেন উত্তর ২৪ পরগণা জেলার এক স্কুল শিক্ষক ও তার ছাত্ররা।
উত্তর ২৪ পরগণা জেলার সোদপুর দেশবন্ধু বিদ্যাপীঠের (বালক) পদার্থবিদ্যার শিক্ষক ড. পশুপতি মণ্ডল তার ছাত্রদের নিয়ে তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে নির্মিত একটি বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র। এই যন্ত্রটি বাজারের লাইটনিং অ্যারেস্টারের তুলনায় বহুলাংশে সস্তা এবং কার্যকর। মূলত প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ শুরু হয়।
মণ্ডল জানান, তিনি প্রায় দেড়শো গবেষণা পত্র পড়ে এই যন্ত্রটি তৈরির কাজ শুরু করেন। যন্ত্রটিতে রয়েছে একটি বাঁশের খুঁটি, পাতলা অ্যালুমিনিয়াম পাত এবং আর্থিং-এর জন্য তামার তার। প্রথম দিকে সাইকেলের রিম ও স্পোক ব্যবহার করা হলেও পরে তা পরিমার্জিত হয়। বর্তমানে এই যন্ত্রে প্রায় তিন হাজার সূচাগ্র প্রান্ত ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ লাইটনিং অ্যারেস্টারে থাকে মাত্র তিন থেকে পাঁচটি।
যন্ত্রটি প্রায় ১৯০ থেকে ২১০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় বজ্রপাত আটকাতে সক্ষম। এই যন্ত্রটির কার্যকারিতা ব্যাঙ্গালোরের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ গবেষণা কেন্দ্র (সেন্ট্রাল পাওয়ার রিসার্চ ইন্সটিটিউট) দ্বারা পরীক্ষিত ও সনদপ্রাপ্ত।
মণ্ডল জানান, পরীক্ষাগারে তারা দেখেছেন কয়েক মিলি-সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় এক লক্ষের বেশি ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহ এই যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে ভূমিগত হয়ে যায়।
এই যন্ত্র তৈরির উদ্যোগে শিক্ষক পশুপতি মণ্ডলের পাশাপাশি যুক্ত রয়েছে হ্যাম রেডিও অপারেটরদের সংগঠন ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব এবং ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট।
ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস জানান, একটি যন্ত্র বানাতে খরচ হয় প্রায় হাজার দুয়েক ভারতীয় টাকা। গোঁড়ার দিকে বিনা খরচেই তারা গ্রামের চাষের ক্ষেতে এই যন্ত্র বসিয়ে দিতেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন ঘেঁষা গোসাবার বিপ্রদাসপুর গ্রামের কৃষক পঞ্চানন মণ্ডল তার প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে এই যন্ত্র বসিয়েছেন। বর্তমানে কর্ণাটকে ধান রোয়ার কাজ করতে গিয়ে তিনি জানান, দেশে নিজের জমিতে এই যন্ত্র থাকায় তিনি নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন। তার দেখাদেখি গ্রামে মোট ১৬-১৭ জন কৃষক তাদের ক্ষেতে এই বজ্র নিরোধক বসিয়েছেন। যদিও তামার তার চুরির ভয়ে পঞ্চানন মণ্ডলকে কর্ণাটকে যাওয়ার আগে যন্ত্রটি খুলে ঘরে রেখে যেতে হয়েছে।
নাগ বিশ্বাস জানান, যন্ত্র বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন আশেপাশে বড় গাছ না থাকে এবং আর্থিং-এর তারটি শুকনো জায়গায় ভাল করে পুঁতে দেওয়া হয়।
আরটিভি/এএইচ