মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ , ১১:২০ পিএম
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি চিনতে পারার মতো জটিল বুদ্ধিমত্তা কেবল বড় মস্তিষ্কের কিছু প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট আকারের এক সামুদ্রিক মাছ ব্লুস্ট্রিক ক্লিনার র্যাস— আয়না ব্যবহার করে নিজের শরীরের দাগ শনাক্ত করতে সক্ষম।
আয়না পরীক্ষায় নতুন চমক
প্রাণীর আত্ম-চেতনা যাচাইয়ের জন্য বহু বছর ধরে “মিরর টেস্ট” বা আয়না পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। এই পরীক্ষায় প্রাণীর শরীরের এমন জায়গায় একটি দাগ দেওয়া হয়, যা সে সরাসরি দেখতে পারে না। আয়নায় দেখে যদি প্রাণীটি নিজের শরীরের সেই দাগ খোঁজার চেষ্টা করে, তাহলে সেটিকে আত্ম-চেতনার প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।
এতদিন এই পরীক্ষায় সফল হয়েছিল শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং, ডলফিন, হাতি এবং কিছু পাখি।
তবে এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো একটি ছোট মাছ।
দাগ দেখে শরীর ঘষে পরিষ্কার করার চেষ্টা
গবেষণায় মাছটির শরীরে পরজীবীর মতো দেখতে একটি বাদামি দাগ দেওয়া হয়। আয়না সামনে থাকলে মাছটি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ওই দাগের স্থানে শরীর ঘষতে থাকে—যেন সেটি পরিষ্কার করতে চাইছে।
কিন্তু আয়না সরিয়ে ফেললে এই আচরণ বন্ধ হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে মাছটি আয়না ব্যবহার করে নিজের শরীরের অবস্থা বুঝতে পারছে।
বিতর্কে বিজ্ঞানীরা
এই আবিষ্কার নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে।
একদল মনে করছেন, এটি আত্ম-সচেতনতার একটি প্রাথমিক রূপ। অন্যদিকে, কেউ কেউ বলছেন— মাছটি হয়তো কেবল আয়নার প্রতিচ্ছবি ও শরীরের অনুভূতির মধ্যে সম্পর্ক শিখেছে, যা প্রকৃত আত্ম-চেতনা নয়।
কেন বিশেষ এই মাছ?
ব্লুস্ট্রিক ক্লিনার র্যাস সাধারণত ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীরে বাস করে। এদের কাজ হলো বড় মাছের শরীর থেকে পরজীবী ও মৃত কোষ পরিষ্কার করা।
এই কাজের জন্য তারা খুব সূক্ষ্ম দাগ বা চিহ্ন শনাক্ত করতে দক্ষ। সেই কারণেই গবেষকরা এই মাছটিকে আয়না পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত মনে করেছিলেন।
পরীক্ষার নতুন ধাপেও একই ফল
সমালোচনার মুখে গবেষকরা পরীক্ষার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনেন। এবার প্রথমে মাছের শরীরে দাগ দেওয়া হয়, পরে আয়না দেখানো হয়।
দেখা যায়, মাছগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই (প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে) দাগের জায়গা ঘষতে শুরু করে। আগের পরীক্ষায় যেখানে কয়েক দিন সময় লাগত, সেখানে এবার প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক দ্রুত।
এতে ধারণা জোরালো হয়েছে যে মাছটি আয়নার প্রতিচ্ছবি ও নিজের শরীরের অনুভূতির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নতুন ভাবনা
এই গবেষণা প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
এখন দেখা যাচ্ছে— কাক জটিল সমস্যা সমাধান করতে পারে, অক্টোপাস পরিবেশ বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়, মৌমাছিও শেখে নিয়ম।
এই তালিকায় যুক্ত হলো একটি ছোট মাছ, যা প্রমাণ করছে— বুদ্ধিমত্তা কেবল বড় মস্তিষ্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।
প্রাণী কল্যাণেও নতুন প্রশ্ন
গবেষণার ফলাফল প্রাণীদের প্রতি আচরণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে। মাছ যদি এমন জটিল আচরণ করতে পারে, তবে তাদের সংরক্ষণ, পালন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
ছোট মাছ, বড় প্রশ্ন
ছোট্ট ব্লুস্ট্রিক ক্লিনার র্যাস এখন বিজ্ঞানীদের সামনে বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে— আত্ম-চেতনা আসলে কী? আর কোন প্রাণীরা সত্যিই নিজেদের চিনতে পারে?
গবেষণাটি প্রমাণ করেছে, প্রকৃতির অনেক রহস্য এখনও অজানা—আর সেই রহস্য উন্মোচনে কখনো কখনো বড় নয়, ছোট প্রাণীরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। সূত্র: ইয়াহু
আরটিভি/এমএইচজে