images

সোশ্যাল মিডিয়া

এবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পাশে হাফেজ্জী

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬ , ০৭:৫১ পিএম

সমাজের সবচেয়ে নীরব, অসহায় ও অবহেলিত মানুষের কাতারে প্রতিবন্ধী মানুষরা সবসময়ই অন্যতম। তাদের কষ্ট অনেক সময় চোখে দেখা যায় না, তাদের না বলা যন্ত্রণা সমাজের সামনে আসে না, তাদের বেদনা পরিবারের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ গত এক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পরিবারকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই বিশেষ উদ্যোগের নাম ‘প্রতিবন্ধী কল্যাণ কর্মসূচি’।

এই কর্মসূচির আওতায় শনিবার (৪ এপ্রিল) হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ অসহায়, অবহেলিত ও বিপন্ন প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর মাঝে প্রায় ৪ লক্ষ টাকার সমপরিমাণ সহায়তা সামগ্রী বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ছিল উন্নতমানের হুইলচেয়ার, প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা-মায়েদের জন্য উন্নত মানের লুঙ্গি ও থ্রি-পিস, এবং প্রয়োজনভিত্তিক আরও বিভিন্ন মানবিক সহায়তা। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি কোনো একদিনের প্রদর্শনীমূলক কর্মসূচি নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি মানবিক অঙ্গীকারের অংশ।

হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, একটি প্রতিবন্ধী সন্তানকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবারে নানামুখী সংকট তৈরি হয়। আশপাশের বহু মানুষ তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। আত্মীয়স্বজন দূরে সরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বাবাও সন্তানের দায়িত্ব নিতে চান না। কোথাও কোথাও একটি প্রতিবন্ধী সন্তানকে ঘিরে সংসারে অশান্তি বাড়ে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়, এবং শেষ পর্যন্ত বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। অনেক মা আছেন, যারা একা হাতে প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, অথচ তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।

সংস্থাটি আরও জানায়, সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতার একটি হলো অনেক প্রতিবন্ধী শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী এবং অসহায় ব্যক্তি নিজেদের পরিবারের খুব কাছের লোকদের মাধ্যমেও মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বিশেষ করে বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষদের বাস্তবতা আরও বেশি হৃদয়বিদারক। তারা অনেক সময় নিজের কষ্ট স্পষ্ট করে বলতে পারেন না, অভিযোগ জানাতে পারেন না, কার কাছে কীভাবে বলবেন সেটিও বোঝাতে পারেন না। ফলে তাদের বুকের ভেতরের কান্না, ভয়, অপমান এবং নিরাপত্তাহীনতা অদৃশ্যই থেকে যায়। সমাজ তাদের দেখে, কিন্তু বোঝে না; শুনে, কিন্তু শোনে না। এই নীরব মানুষেরা তাই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা, সহমর্মিতা ও পরিকল্পিত সহায়তার দাবিদার।

রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য যে ভাতা দেওয়া হয়, তা মোটামুটি সাড়ে ছয়শো থেকে সাতশো টাকার মতো। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতায় এই অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ হয় না। অথচ এসব পরিবারের প্রয়োজন শুধু সামান্য নগদ সহায়তা নয়; প্রয়োজন চিকিৎসা, থেরাপি, চলাচলের ব্যবস্থা, পুষ্টিকর খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, পোশাক, মানসিক সাহস, পুনর্বাসন এবং আয়মুখী সুযোগ। এই জায়গা থেকেই হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ তাদের কাজকে কেবল দান-সদকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনভিত্তিক সহায়তার দিকে নিয়ে গেছে।

গত এক বছরে সংস্থাটি প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর জন্য ধারাবাহিকভাবে নানা সহায়তামূলক উদ্যোগ পরিচালনা করেছে। কুরবানির সময় গোশত বিতরণ, রমজানে পূর্ণাঙ্গ বাজার সহায়তা, চিকিৎসা সহযোগিতা, মাসিক থেরাপির ব্যবস্থা, উন্নতমানের নতুন হুইলচেয়ার বিতরণ, এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সহায়তা এসবই সেই চলমান কার্যক্রমের অংশ। রমজান মাসে হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর হাতে এক মাসের পূর্ণাঙ্গ বাজার পৌঁছে দেয়। এগুলো শুধু খাদ্যসামগ্রী নয়, বরং একটি কষ্টে থাকা পরিবারের জন্য স্বস্তি, সম্মান এবং মানবিকতার বার্তা।

সংস্থার তথ্যমতে, যেসব হুইলচেয়ার বিতরণ করা হয়েছে, সেগুলো সাধারণ মানের নয়; বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত, ব্যবহারোপযোগী যার প্রতিটির মূল্য প্রায় ১৭ হাজার টাকা। পাশাপাশি সংস্থাটি লক্ষ্য করেছে, অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন, যাদের ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার থাকলেও ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে তারা চলাফেরা করতে পারেন না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ তাদের জন্য নতুন ব্যাটারি কিনে দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে।

হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা কেবল একবার সহায়তা দিয়ে থেমে থাকে না; বরং কয়েক মাস পরপরই প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোর জন্য বিভিন্ন প্রজেক্ট ও সুবিধা নিয়ে তাদের পাশে হাজির হচ্ছে। এর মাধ্যমে সংস্থাটি বোঝাতে চায় তারা সাময়িক ছবি তোলার কাজ করছে না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও দায়িত্বশীল মানবিক যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছে। 

এই ধারাবাহিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ খুব শিগগিরই তাদের তত্ত্বাবধানে সেলাই শেখার কার্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি সংস্থাটি সম্পূর্ণ নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করবে। সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও উপযুক্ত পরিবারগুলোর সদস্যদের সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তারা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আয়ের পথ খুঁজে পান। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর যারা এই সেলাই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করবেন, তাদেরকে সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে এবং তাদের মধ্যে উপযুক্তদের সেলাই মেশিন উপহার দেওয়া হবে, যাতে তারা প্রশিক্ষণ শেষে ঘরে বসেই কাজ শুরু করতে পারেন এবং স্বাবলম্বী জীবনের পথে এগোতে পারেন।

এর পাশাপাশি সংস্থাটি অনেক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য থেরাপির ব্যবস্থাও করছে। বহু শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়মিত থেরাপি ছাড়া চলাচল, শারীরিক ভারসাম্য, দৈনন্দিন কাজকর্ম কিংবা স্বাভাবিক জীবনধারায় ফিরতে পারেন না। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে মাসিক থেরাপির খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ তাদের জন্য মাসিক থেরাপির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা তাদের চলমান মানবিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সামনে তারা একটি নিরাপদ হোম বা আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে আশ্রয়হীন প্রতিবন্ধী শিশু, অসহায় ভাই বা বোন, কিংবা এমন মায়েরা জায়গা পাবেন, যাদের স্বামী তাদের ফেলে চলে গেছেন অথবা যাদের থাকার মতো কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। এই হোম শুধু থাকার ব্যবস্থা করবে না; বরং এটি হবে নিরাপত্তা, যত্ন, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার একটি কেন্দ্র।

দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিম বৃদ্ধি করে প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা, তাদের প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা, নিয়মিত খোঁজ রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলার কাজও শুরু করেছে সংস্থাটি। কৃষিভিত্তিক সহায়তা, গবাদিপশু প্রদান, আয়মুখী পুনর্বাসন, সেলাই মেশিন প্রদান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অন্যান্য প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার মাধ্যমে পরিবারগুলোকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নিয়ে তারা কাজ করছে।

হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ নিজেদের একটি একমুখী সেবামূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলছে, যারা শুধু প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নয়, বরং আরও বহু মানবিক খাতে কাজ করে যাচ্ছে। গাজা ও সুদানে মানবিক কার্যক্রম, বাংলাদেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নন-মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য মাদ্রাসা ও মক্তব, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, এবং দেশের বিভিন্ন ঘরানার শীর্ষস্থানীয় আলেমদের নিয়ে নানামুখী সামাজিক ও মানবিক কাজের মাধ্যমে সংস্থাটি বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই সেবামডেল গড়ে তুলতে চায়।

এই বিষয়ে হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সম্মানিত সিনিয়র সহ সভাপতি অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য শুধু সামান্য ভাতা বা অস্থায়ী সহায়তা যথেষ্ট নয়। তাদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, থেরাপি, চলাচলের সুযোগ, মানসিক সুরক্ষা, পারিবারিক নির্যাতন থেকে রক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার পথ নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত মানবিক দায়িত্ব। বিশেষ করে বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ভাই-বোনদের না-বলা কষ্ট, তাদের বুকের ভেতরে জমে থাকা ভয়, অপমান এবং অসহায়ত্ব আমাদের গভীরভাবে ভাবায়। তারা অনেক সময় নিজের ব্যথা প্রকাশ করতে পারে না, অভিযোগ জানাতে পারে না, এমনকি পরিবারের খুব কাছের মানুষদের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হলেও তা বোঝাতে পারে না। তাই তাদের পাশে দাঁড়ানো শুধু দয়া নয়, এটি এক গভীর আমানত।

চ্যারিটির মহাপরিচালক মুহাম্মদ রাজ বলেন, হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ কোনো একদিনের কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে না। কয়েক মাস পরপরই আমরা নতুন নতুন প্রজেক্ট, নতুন সুবিধা এবং নতুন পরিকল্পনা নিয়ে তাদের পাশে যাচ্ছি। সামনে আমাদের তত্ত্বাবধানে সেলাই শেখার কার্যক্রম চালু হবে, সেখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের সার্টিফিকেট ও সেলাই মেশিন দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। যাদের থেরাপি দরকার, তাদের মাসিক থেরাপির ব্যবস্থাও আমরা করার চেষ্টা করছি। আমরা চাই, একটি প্রতিবন্ধী মানুষ কেবল সহায়তা নিয়েই বেঁচে থাকবে না; বরং সে যেন নিজের মর্যাদা নিয়ে, দক্ষতা নিয়ে, সম্মান নিয়ে সমাজে দাঁড়াতে পারে।

চ্যারিটির মাওলানা ইবরাহিম খলিল বলেন, সমাজের হৃদয়বান মানুষ, আলেম-উলামা, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং সেবাপ্রাণ সকল শ্রেণির মানুষকে আমরা এই কাজে পাশে চাই। একটি প্রতিবন্ধী মানুষকে সহায়তা করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সাহায্য করা নয়; বরং একটি পরিবারকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা, একটি মায়ের কাঁধের ভার হালকা করা, একটি শিশুর ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা, এবং একটি সমাজকে আরও মানবিক করে তোলা।

হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ মনে করে, সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবসেবা।

আরটিভি/এসকে