images

দেশজুড়ে / বিশেষ প্রতিবেদন

হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা

মঙ্গলবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ , ০৫:৩৩ পিএম

মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতি গোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংযুক্ত না করায় মাতৃভাষার চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মৌলভীবাজারের আদিবাসীরা। তাদের মাতৃভাষা চর্চা এখন অনেকটাই মৌখিক কথার ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে। জেলার বেশিরভাগ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষা পড়তে-লিখতে পারেন না।

প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়গুলোতেও নেই তাদের নিজস্ব ভাষা চর্চার কোনও বই কিংবা শিক্ষক। এতে আদিবাসী গ্রামগুলোতে নিজেদের মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে।

এছাড়া চা বাগানগুলোতে শ্রমিক হিসেবে যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে রয়েছে তেলেগু, রবিদাস, কৈরীসহ আরও বেশকিছু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন সাধারণত পাহাড় ও টিলার পাদদেশ, বন কিংবা সমতল ভূমিতে বসবাস করে আসছেন দীর্ঘ দিন ধরে।

চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত এসব নৃগোষ্ঠী জাতীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রেখে চলেছেন। তারপরও শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং একইসঙ্গে ভূমির অধিকারসহ মাতৃভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে আছে এসব জনগোষ্ঠী।

জানা যায়, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা উপজেলায় খাসি, গারো, মনিপুরী, ত্রিপুরা, মুন্ডা, ওরাঁও সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস। তাদের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি থাকলেও বাংলা ভাষা শিখতে গিয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের মাতৃভাষা। বিশেষ করে বিপাকে পড়তে হচ্ছে শিশুদের। স্কুলে বাংলা ভাষা বুঝতে না পারায় এ ভাষাকে রপ্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে তারা। এতে তারা নিজেদের মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের দাবী বাংলার পাশাপাশি যেন তাদের ভাষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়। তারপর প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে চাকমা, মারমা, ককবোরক, মান্দি ও সাদরি ভাষার পাঠ্যপুস্তক তৈরি, শিক্ষক ও প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শুরু করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। কিন্তু গত নয় বছরেও সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় মাতৃভাষা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আদিবাসীরা। সংকটে পরেছে তাদের মাতৃভাষা।

তবে, দেশে যেসব নৃগোষ্ঠী রয়েছে তাদের বেশির ভাগেরই রয়েছে নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব বর্ণমালা। কিন্তু দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের নিজস্ব বর্ণমালা বা ভাষা শেখানো হয় না। চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে এখন এসব নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে।

অথচ দেশের সব নাগরিকের নিজ নিজ মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার রয়েছে এবং রাষ্ট্রেরও কর্তব্য তাদের ভাষা ও বর্ণমালা চর্চা ও সংরক্ষণে মনোযোগী হওয়া বলে জানালেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী।

লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান ফিলাপত্মী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না থাকায় আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নৃগোষ্ঠীর শিশুদের বাংলা ভাষায় পড়ানো হচ্ছে। ফলে ছোটবেলা থেকেই তারা বাংলা ভাষা রপ্ত করছে। এ কারণে আমাদের অনেকেই নিজেদের ভাষায় কথা বলতে পারলেও লিখতে পারে না।

মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান জিডিসন প্রধান সুচিয়াং জানান, বৃহত্তর সিলেটের ৭০টি খাসিয়া পুঞ্জির মধ্যে হবিগঞ্জের আলীয়াছড়া ও জাফলং এলাকার নকশিয়ার পুঞ্জিতে দু’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর কোনও সরকারি বিদ্যালয় নেই। তবে খাসিয়াদের চাঁদায় পরিচালিত হচ্ছে কয়েকটি কমিউনিটি বিদ্যালয়। এসব কমিউনিটি বিদ্যালয়ে নিজস্ব ভাষা চর্চার চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও বলেন, নিজেদের ভাষার চর্চা ধরে রাখতে কিছু পুঞ্জিতে নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলগুলোতে খাসিয়া ভাষা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এভাবে এসব ভাষা টিকিয়ে রাখা সম্ভব না।  সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের ভাষাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা জরুরি।

কমলগঞ্জের মহারাজ গম্বীর সিংহ মেমোরিয়াল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ফাল্গুনী সিংহ বলেন, স্কুল বা ভাষা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান, মাতৃভাষা চর্চা কেন্দ্র এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার কারণে মণিপুরীসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এসব ভাষা বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

এদিকে, শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, একটি ভাষাকে আমরা কখনও হারিয়ে যেতে দিতে পারিনা। এ ব্যাপারে আমরা আন্তরিক, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতি গোষ্ঠীর নিজস্ব যে ভাষা সেটি আমাদের ধরে রাখতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে প্রক্রিয়াটি চালু হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

এজে