images

খেলা / ফুটবল

১৯৬৬ থেকে ২০২৬: বিশ্বকাপ মাতিয়েছে যেসব মাসকট

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ , ০৪:১৫ পিএম

আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা, এরপরই শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় আসর ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ মানেই শুধু ফুটবলের এক মহাযজ্ঞ নয়; এটি আসলে সংস্কৃতি, আবেগ আর নানা প্রান্তের মানুষের মোহনাস্থল। স্টেডিয়ামে লাখো দর্শকের উচ্ছ্বাস যেমন টুর্নামেন্টকে প্রাণবন্ত করে তোলে, তেমনি প্রতিটি আসরের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো তার অফিসিয়াল মাসকট। 

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তিনটি মাসকট উন্মোচন করেছে ফিফা। মূলত, বিশ্বকাপের আয়োজক ভিন্ন তিন দেশ হওয়ায় আলাদা আলাদা মাসকট উন্মোচন করা হয়েছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর কল্পনাশক্তিকে তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বের সামনে। 

অবশ্য জেনে অবাক হবেন যে বিশ্বকাপের শুরুর দিকে এমন কোনো রীতি ছিল না। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকেই প্রথমবারের মতো মাসকটের যাত্রা শুরু। তারপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপ যেন নিজের আলাদা এক চরিত্র খুঁজে নেয় মাস্কটের মধ্য দিয়ে। 

পাঠকদের জন্য সবগুলো বিশ্বকাপের মাসকটের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—

ক্লাচ, মেপল ও জায়ু (২০২৬) 

২০২৬ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ফলে তিন দেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ক্লাচ, মেপল ও জায়ুকে। ক্লাচ নামের ঈগল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি। 

LIT__ON_cop_y_20250926_131204960_(1)

কানাডার প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছে মেপল মুজ নামের হরিণবিশেষ। আর জায়ু হচ্ছে মেক্সিকোর জঙ্গল থেকে আসা এক জাগুয়ার। এই তিন মাসকটকেই ফুটবলার হিসেবে দেখানো হয়েছে। যেখানে মেপল গোলকিপার, জায়ু স্ট্রাইকার ও ক্লাচ হচ্ছে মিডফিল্ডার। 

লা’ইব (২০২২)

কাতার বিশ্বকাপের মাসকট ছিল ‘লা’ইব’। আরবিতে যার অর্থ অতিমাত্রায় দক্ষ খেলোয়াড়। এটি মূলত আরব সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী পুরুষদের মাথার কাপড় ‘ঘুতরা’-কে মানবসদৃশ রূপ দিয়ে তৈরি করা এক বন্ধুসুলভ চরিত্র। মাসকটটির সাদা রঙ বেছে নেওয়া হয়েছিল পবিত্রতা বা বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে।

 

জাবিভাকা (২০১৮)

রাশিয়া বিশ্বকাপে মাসকট ছিল ‘জাবিভাকা’ নামের এক নেকড়ে। রুশ ভাষায় যার অর্থ ‘গোলদাতা’। স্পোর্টস গগলস পরা এই নেকড়ে ছিল আত্মবিশ্বাসী আর দ্রুতগতির প্রতীক। অনলাইন ভোটে বাঘ আর বিড়ালকে হারিয়ে এটি অফিসিয়াল মাসকট হয়েছিল। 

ফুলেকো (২০১৪)

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের মাসকট ছিল ‘ফুলেকো’—একটি ব্রাজিলিয়ান থ্রি-ব্যান্ডেড আর্মাডিলো। সাদা রঙের ‘ব্রাজিল ২০১৪’ লেখা জার্সি ও সবুজ শর্টস পরা বিশেষ প্রজাতির আর্মাডিলো শুধু ব্রাজিলেই পাওয়া যায় এবং এটি বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর তালিকাভুক্ত।

তাই ফুলেকোকে মাসকট হিসেবে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ব্রাজিল তাদের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের প্রতিও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিল। 

জাকুমি (২০১০)

দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের মাসকট ছিল এক চিতা—‘জাকুমি’। নামের ‘জেডএ’ এসেছে সাউথ আফ্রিকার সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে, আর ‘কুমি’ মানে দশ। পুরো নামটি ২০১০ বিশ্বকাপকেই প্রতিনিধিত্ব করেছে।

গোলেও (২০০৬)

২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের মাসকটের নাম ছিল ‘গোলেও সিক্স’। ‘গোল’ এবং ‘লিও’ শব্দ দুটির সমন্বয়ে তৈরি এই নামের সিংহটি জার্মান জাতীয় দলের রঙের পোশাক পরেছিল।

তার সঙ্গে ছিল ‘পিলে’ নামের একটি ফুটবল, যা জার্মানিতে ফুটবলের প্রচলিত কথ্য নাম হিসেবেও পরিচিত। 

আতো, কাজ ও নিক (২০০২)

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের যৌথ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো দেখা যায় কম্পিউটার জেনারেটেড মাসকট। কমলা, বেগুনি ও নীল রঙের তিনটি কম্পিউটার-নির্মিত চরিত্রের সবাই ছিল কাল্পনিক ফুটবলসদৃশ খেলা ‘অ্যাটমবল’-এর একটি দলের সদস্য।

সেখানে ‘আতো’ ছিল কোচ, আর ‘কাজ’ ও ‘নিক’ ছিল খেলোয়াড়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং আয়োজক দেশগুলোর ম্যাকডোনাল্ডস আউটলেটে হওয়া ভোটের মাধ্যমে এই তিন চরিত্রের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

ফুটিক্স (১৯৯৮)

১৯৯৮ বিশ্বকাপে মাসকট হিসেবে ফরাসি ঐতিহ্যের প্রতীক মোরগকে বেছে নেয় ফ্রান্স। লাল-নীল রঙের সেই মোরগের নাম দেওয়া হয় ‘ফুটিক্স’। ‘ফুটবল’ আর বিখ্যাত কমিক চরিত্র ‘অ্যাস্টেরিক্স’-এর নাম মিলিয়েই এই নামকরণ।

স্ট্রাইকার (১৯৯৪)

১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের মাসকট ছিল একটি কুকুর। যা আমেরিকান পরিবারগুলোর অন্যতম জনপ্রিয় পোষা প্রাণী। লাল, সাদা ও নীল রঙের ফুটবল জার্সি পরা এই কুকুরটির পোশাকে বড় করে লেখা ছিল ‘ইউএসএ ৯৪’। 

চাও (১৯৯০)

ইতালিয়া ’৯০ বিশ্বকাপে এল সম্পূর্ণ নতুন এক ধারণা। ‘চাও’ ছিল জ্যামিতিক আকৃতিতে তৈরি এক বিমূর্ত ফুটবলার—যার মাথার জায়গায় ছিল ফুটবল। ইতালির পতাকার সবুজ, সাদা ও লাল রঙে সাজানো এই মাসকট ছিল আধুনিক শিল্পের এক অনন্য প্রয়োগ। এখন পর্যন্ত এটিই ছিল একমাত্র মুখবিহীন মাসকট।

পিকে (১৯৮৬)

এই বছর মেক্সিকো দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ আয়োজন করে। তবে এবার মাসকট হিসেবে নিয়ে আসে ‘পিকে’ নামের একটি মরিচ। এবারও ফিরে আসে পরিচিত সেই সোমব্রেরো টুপি। তবে এবার সেটি কোনো ছেলের মাথায় ছিল না, দেখা গেলো এক বিশাল মরিচের গায়ে। 

যেহেতু মরিচের আদি নিবাস মেক্সিকো। তাই ‘পিকে’ নামের এই মাসকটের মুখে ছিল আদর্শ মেক্সিকান ঘরানার বড় গোঁফও। স্পেনের ‘নারানহিতো’ যেভাবে ফল ও সবজিভিত্তিক মাসকটের ধারা শুরু করেছিল, পিকে যেন সেই ধারাকেই আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে।

নারানহিতো (১৯৮২)

স্পেন বিশ্বকাপে মাসকটের ডিজাইনে বড় পরিবর্তন আসে। এবার মানুষ নয়, প্রতীক হিসেবে দেখানো হয় কমলা। যার নাম ‘নারানহিতো’। স্পেনের পরিচিত ফল কমলাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় চরিত্রটি। নির্মাতারা ইচ্ছে করেই ষাঁড়ের মতো প্রচলিত প্রতীক এড়িয়ে গিয়েছিলেন। 

গাউচিতো (১৯৭৮)

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের মাসকট ছিল ‘গাউচিতো’। আর্জেন্টাইন কাউবয় সংস্কৃতির প্রতীকী রূপ ছিল এই চরিত্র। আলবিসেলেস্তেদের জার্সি, গলায় হলুদ স্কার্ফ আর হাতে গাউচোদের ঐতিহ্যবাহী চাবুক—সব মিলিয়ে গাউচিতো ছিল আর্জেন্টিনার লোকজ সংস্কৃতির ফুটবল সংস্করণ। 

টিপ অ্যান্ড ট্যাপ (১৯৭৪)

পশ্চিম জার্মানির বিশ্বকাপ মাসকটে ছিলো দুই শিশু— যার একজন স্বর্ণকেশী, অন্যজন কালো চুলের। জার্মান জাতীয় দলের জার্সি পরা দুই শিশুর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘টিপ’ অ্যান্ড ‘ট্যাপ’। 

দু’জনের জার্সিতে ছিল ‘ডাব্লিউএম’ এবং ‘৭৪’ লেখা। অনেকে মনে করেন, এই দুই চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির ঐক্যের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। 

হুয়ানিতো (১৯৭০)

ইংল্যান্ডের সাফল্যের পর মেক্সিকোও একই পথে বানায় ‘হুয়ানিতো’। মেক্সিকোর ঐতিহ্যের অংশ সোমব্রেরো টুপি পরা ছোট্ট এক মেক্সিকান ছেলে—যার মুখে ছিল ফুটবলের আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। বিজ্ঞাপনের গ্রাফিক ডিজাইনার হুয়ান গঞ্জালেজ মার্টিনেজ চেয়েছিলেন ফুটবলকে শিশুদের আনন্দের ভাষায় তুলে ধরতে। 


 
ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি (১৯৬৬)

বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম মাসকট ছিল ‘উইলি’ নামের এক সিংহ। যাকে ফাদার অব অল ওয়ার্ল্ডকাপ মাসকটও বলা হয়। ইংল্যান্ডের জাতীয় প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল তাকে। ব্রিটিশ পতাকার রঙে সাজানো ফুটবল জার্সি পরা এই সিংহ মুহূর্তেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

শিল্পী রেগ হয়ের তৈরি এই চরিত্রটি শুধু শিশুদের কাছেই নয়, পুরো ফুটবল দুনিয়ার কাছেই নতুন এক আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ড জেতে তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ। 

আরটিভি/এসআর