images

খেলা / ফুটবল

কাতার বিশ্বকাপের পর যা ঘটেছে বিশ্ব ফুটবলে

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ , ০৫:১৪ পিএম

 
চার বছর আগে ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনা ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অম্লান থাকবে।

যেসব সাধারণ দর্শক ২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষে আবার ফুটবলের দিকে নজর দিতে প্রস্তুত হচ্ছেন, তাদের অনেকের জন্যই চার বছর আগে মেসির সেই আবেগঘন ট্রফি উঁচিয়ে ধরা এবং উদযাপনই হয়তো শেষ দেখা ফুটবল ম্যাচ ছিল।

এরপরের বছরগুলোতে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক দুই পর্যায়েই অনেক কিছু ঘটেছে। বড় বড় খেলোয়াড় বদলি হয়েছে, জনপ্রিয় কোচ নিয়োগ ও বরখাস্ত হয়েছেন, বিভিন্ন ট্রফি জয় হয়েছে, আর অনেক নামী ক্লাব ও খেলোয়াড়দের ভাগ্যে নাটকীয় উত্থান-পতন হয়েছে।

আরও পড়ুন
LIT__ON_copy

বিনামূল্যে খেলা দেখাবে ‘লাইভমোড’ এবং ‘কেজটিভি’, সুযোগ পাবে কী বাংলাদেশিরা

২০২৬ বিশ্বকাপের অপেক্ষায় থাকা ফুটবল সমর্থকদের জন্য এই চার বছরের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো—

মেসি ইন্টার মিয়ামিতে যোগদান এবং এমএলএস শিরোপা জয় 

আর্জেন্টিনাকে বহু দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোপা আমেরিকা  এবং ফিফা বিশ্বকাপ শিরোপা  জেতানোর পর মেসি ২০২২-২৩ মৌসুমের বাকি অংশ পিএসজেিত কাটান। এরপর ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে তিনি নতুন এক অধ্যায় শুরু করেন।

৩৬ বছর বয়সে সাতবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী মেসি ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের ছেড়ে ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেন। এই স্থানান্তর বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এখনও দারুণ ফর্মে থাকা মেসি মিয়ামির হয়ে ১০৪ ম্যাচে ৯০ গোল করেছেন এবং ক্লাবটিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম তিনটি বড় শিরোপা উপহার দিয়েছেন- লিগ কাপ (২০২৩), এমএলএস সাপোটার্স শিল্ড (২০২৪) ও এমএলএস কাপ (২০২৫)।

এর পাশাপাশি বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্বে তিনি নিজের অষ্টম ব্যালন ডি'অরও জিতেছেন।

পিএসজি ছেড়ে এমবাপ্পের রিয়াল মাদ্রিদে যাত্রা

২০২৪ সালের জুনে রিয়াল মাদ্রিদ দীর্ঘদিনের ট্রান্সফার জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম কাঙ্খিত ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পিএসজি থেকে দলে ভেড়ায়।

অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে এমবাপ্পে মাদ্রিদে গিয়েই বড় বড় শিরোপা জিতবেন। কিন্তু প্রথম দুই মৌসুমে তিনি কোনো বড় ট্রফি জিততে পারেননি। যদিও সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১০৩ ম্যাচে ৮৬ গোল করেছেন, তবুও মাদ্রিদের সমর্থকদের পূর্ণ সমর্থন অর্জন করতে কিছুটা সংগ্রাম করতে হয়েছে।

অন্যদিকে এক ধরনের বিদ্রুপাত্মক মোড় নিয়ে পিএসজি ইউরোপের অন্যতম সেরা দলে পরিণত হয়েছে। বহু বছর ধরে তারা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের চেষ্টা করেছে। কিন্তু নেইমার, এমবাপ্পে ও মেসিকে বিদায় দিয়ে তরুণ প্রতিভায় বিনিয়োগ করার পরই তারা শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য অর্জন করে।

লামিন ইয়ামাল মেসির উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভূত হন

বহু বছর ধরে ইউরোপীয় ফুটবল নতুন এক বিস্ময়কর তরুণ প্রতিভার অপেক্ষায় ছিল। মনে হচ্ছিল এমবাপ্পেই সেই শূন্যস্থান পূরণ করবেন। কিন্তু ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে লামিন ইয়ামাল নামের ১৫ বছর বয়সী বার্সেলোনার এক খেলোয়াড় আলোচনায় চলে আসেন।

বর্তমানে ১৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গারকে অনেকেই মেসির উত্তরসূরি হিসেবে দেখেন। তিনি ইতোমধ্যে বার্সেলোনার হয়ে তিনটি লা লিগা শিরোপা জিতেছেন এবং স্পেনকে ২০২৪ ইউরো জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

২০২৫ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ের তালিকায় তিনি রানার-আপ হন। তবে তার দ্রুত উত্থান দেখে মনে হয়েছে খুব শিগগিরই তিনি সেই পুরস্কারও জিতে নিতে পারেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অবশেষে আরেকটি বড় ট্রফি জয়

২০২২ বিশ্বকাপের পর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সৌদি  পেশাদার লিগে পাড়ি জমানো।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়র দুই সপ্তাহেরও কম সময় পরে, আল নাসরে যোগ দিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম বড় তারকা হয়ে ওঠেন। তার পথ অনুসরণ কওে পরে আরও অনেক বিশ্বমানের খেলোয়াড় সেখানে যোগ দেন।

তবে বর্তমানে ৪১ বছর বয়সী রোনালদো দীর্ঘ সময় কোনো বড় ট্রফি জিততে পারেননি। অবশেষে এই মাসের শুরুতে তিনি আল নাসরকে সৌদি লিগ শিরোপা জিতিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটান। এর আগে তার সর্বশেষ বড় ট্রফি ছিল জুভেন্টাসের হয়ে জেতা ২০২০-২১ ইতালিয়ান কাপ।

এখন রোনালদোর সামনে আরও বড় লক্ষ্য রয়েছে। তিনি প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন ক্যারিয়ারে ১ হাজারতম গোল করা প্রথম ফুটবলার হতে চান। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭৩।

পুলিসিককে ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন এ্যাডামস

যদিও ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ জাতীয় দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। কিন্তু অনেকের মতে তিনি আর দলের সেরা খেলোয়াড় নন। গত কয়েক বছরে বহুমুখী মিডফিল্ডার টাইলার এ্যাডামসের ধারাবাহিক উন্নতি তাকে এই মর্যাদার শক্তিশালী দাবিদার করে তুলেছে।

এই মৌসুমে এ্যাডামস বোর্নমাউথের ইউরোপা লিগে যোগ্যতা অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এর ফলে ক্লাবটি তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।

নেইমার মাত্র ৬৩টি ম্যাচ খেলেছেন 

যেখানে মেসি ও রোনালল্ডো এখনও নিয়মিত গোল করে চলেছেন, সেখানে নেইমারের ক্যারিয়ার ২০২২ বিশ্বকাপের পর নাটকীয়ভাবে নিম্নমুখী হয়েছে।

ইনজুরি এবং ফর্মহীনতার কারণে বিশ্বকাপের পর থেকে ক্লাব ও দেশের হয়ে তিনি মোট মাত্র ৬৩টি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি নিজের সাবেক ক্লাব সান্তোসে ফিরে যান। সেখানে কিছুটা নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়ার পর ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাকে ২০২৬ বিশ্বকাপ দলে অন্তর্ভুক্ত করার মতো উপযুক্ত মনে করেন। তবে টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির সময়ও তিনি আরেকটি চোটের সমস্যায় পড়েছেন।

ব্যালন ডি'অরে দুই নতুন বিজয়ী

২০০৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ব্যালন ডি'অর প্রায় পুরোপুরি দখলে রেখেছিলেন লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। এই সময়ে মাত্র দুই বছর ছাড়া পুরস্কারটি তারা দুজনে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

তবে দুজনই এখন ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় নতুন মুখের উত্থান ঘটেছে।

২০২৪ সালে রড্রি ব্যালন ডি'অর জেতেন। তিনি ম্যানচেস্টার সিটিকে প্রিমিয়ার লিগ জিততে সাহায্য করেন এবং স্পেনের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও জেতেন।

২০২৫ সালে ওসমানে ডেম্বেলে ব্যালন ডি'অর জেতেন। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে পিএসজি ঐতিহাসিক ট্রেবল জয় করে।

হ্যারি কেইনের ট্রফি জয় 

হ্যারি কেন ২০২২ বিশ্বকাপের পর নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে ধারাবাহিক গোলদাতাদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২৩ সালের শুরু থেকে তিনি ১৪০-এরও বেশি গোল করেছেন এবং ২০২৬ সালের ব্যালন ডি'অরের অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
 
টটেনহ্যামের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া সত্ত্বেও ১৩ বছরে কোনো ট্রফি জিততে পারেননি কেন। কিন্তু ২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

তিনি বায়ার্নের হয়ে ১৪৭ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন এবং অবশেষে নিজের প্রথম বড় শিরোপাগুলো জিতেছেন- দুটি বুন্দেসলিগা, একটি জার্মান কাপ এবং একটি জার্মান সুপারকাপ।

টটেনহ্যাম ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অবনতি

কেনের বিদায়ের পর টটেসহ্যামের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। যদিও তারা ২০২৪-২৫ মৌসুমে ইউরোপা লিগ জিতে ১৭ বছরের ট্রফিখরা কাটায়, একই মৌসুমে তারা প্রিমিয়ার লিগে ১৭তম স্থানে শেষ কওে, ১৯৭৮ সালের পর যা তাদের সবচেয়ে খারাপ ফল।

পরের মৌসুমেও তারা আবার ১৭তম স্থানে শেষ করে এবং রেলিগেশনের কাছাকাছি চলে যায়।

অন্যদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও কঠিন সময় পার করেছে। ইউরোপা লিগের ফাইনালে টটেনহ্যামের কাছে হারের পাশাপাশি তারা লিগে ১৫তম স্থানে শেষ করে, যা ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ প্রিমিয়ার লিগ ফল।

পরে কোচ রুবেন আমোরিমের পরিবর্তে মাইকেল ক্যারিককে আনার পর দলটি ঘুরে দাঁড়ায় এবং তৃতীয় স্থানে থেকে আবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করে।

বার্সেলোনার আর্থিক সংকট এখনও শেষ হয়নি

ফুটবলের অনেক কিছু বদলালেও বার্সেলোনার আর্থিক সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। ২০১৭ সালে নেইমারের বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফারের পর বার্সেলোনা খেলোয়াড় কেনা ও বেতন বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় করতে থাকে। এর ফলে ক্লাবটির ঋণ একসময় ১ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি হয়ে যায়।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তবে চাপ এখনও রয়েছে।

আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে সংস্কারকাজ শেষে কাতালান জায়ান্টদেও আবারও ক্যাম্প ন্যুতে ফিরে আসাকে। ২০২৩ সাল থেকে সংস্কারের কারণে স্টেডিয়ামটি ব্যবহার করা যায়নি। এখন আংশিক ধারণক্ষমতা নিয়ে পুনরায় খোলা হয়েছে। ১,০৫,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতার আধুনিকায়িত স্টেডিয়াম ভবিষ্যতে ক্লাবের আয় বাড়াাতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কয়েকটি দীর্ঘ ট্রফিখরা শেষ হয়েছে

২০২২ সালের পর ইউরোপীয় ফুটবলে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ট্রফিখরার অবসান ঘটেছে। ম্যানচেস্টার সিটি ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে। কোচ পেপ গার্দিওলার দল ফাইনালে ইন্টার মিলানকে হারায় এবং ট্রেবলও জেতে।

বায়ার লেভারকুসেন ২০২৩-২৪ মৌসুমে কোনো ম্যাচ না হেরে বুন্দেসলিগা জিতে ইতিহাস গড়ে। এর মাধ্যমে বায়ার্ন মিউনিখের টানা ১১ শিরোপার আধিপত্য শেষ হয়। কোচ জাবি আলোনসোর দল জার্মান কাপও জেতে।

আর্সেনাল ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ জিতে ২২ বছরের শিরোপাখরা শেষ করে। কোচ মিকেল আর্তেতার নেতৃত্বে তারা ম্যানচেস্টার সিটিকে পিছনে ফেলে শিরোপা জয় করে।

ইংল্যান্ডের পুরুষ দল এখনও ব্যর্থ, নারীরা আবার সফল

ইংল্যান্ডের পুরুষ দল ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের পর এখনও কোনো বড় ট্রফি জিততে পারেনি।
তারা ইউরো ২০২০ এবং ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে উঠলেও যথাক্রমে ইতালি ও স্পেনের কাছে হেরে যায়।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জাতীয় নারী দল সাম্প্রতিক সময়ে দুইবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে-২০২২ ও ২০২৫ সালে। কোচ সারিনা উইগমানের নেতৃত্বে তারা অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে।

জাতীয় দলগুলো তারকা কোচ নিয়োগ দিয়েছে

২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি বড় জাতীয় দল অভিজ্ঞ ও বিশ্বখ্যাত কোচ নিয়োগ  দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্রাজিল- কার্লো আনচেলত্তি, ইংল্যান্ড-থমাস টাচেল, জার্মানী-জুলিয়ান নাগলেসম্যান, উরুগুয়ে-মার্সেলো বিয়েসলা

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বে আছেন মরিসিও পোচেত্তিনো, যিনি আগে টটেনহ্যাম, পিএসজি ও চেলসির কোচ ছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের বেশিরভাগ ম্যাচ এবং ফাইনালের আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার কাছ থেকে বড় কিছু আশা করছে।

আরটিভি/এসআর