মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ০৩:২৬ পিএম
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা এখনও অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার সর্বশেষ র্যাংকিং অনুযায়ী, বিশ্বের ২১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। অথচ ফুটবল মাঠে নিজেদের এই অনুজ্জ্বল পারফরম্যান্সের বিপরীতে সুদূর লাতিন আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোর জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে অন্ধ উন্মাদনা আর মৃত্যুর মিছিলে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ স্থানটি দখল করে রেখেছে এই দেশ।
চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনাল যখন কড়া নাড়ছে, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ফুটবল-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ২০ জন ভক্তের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১২ জনই বাংলাদেশের।
যদিও ফিফা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানান, বিশ্বকাপের মূল স্টেডিয়ামগুলোর ভেতরের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে এবং সেখানে কোনো বড় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মুলত মাঠের বাইরের এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে অতিরিক্ত ভিড়, পাড়া-মহল্লায় সমর্থকদের মধ্যে উগ্র সংঘর্ষ, পতাকা ওড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনা এবং খেলা দেখার চরম উত্তেজনার সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে।
এদিকে, খেলার যোগ্যতা অর্জন না করেও কেবল অন্ধ সমর্থনের জের ধরে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের কড়া সমর্থকগোষ্ঠী ও চিরবৈরী ফুটবল দলগুলোর মধ্যকার মানসিক দ্বন্দ্ব অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় লিওনেল মেসির একটি পেনাল্টি মিস নিয়ে তুচ্ছ তামাশা করায় শরিফুল ইসলাম (৩৮) নামের এক অটোচালককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত শরিফুল আদতে ব্রাজিলের সমর্থক ছিলেন এবং সেদিন শুধুই মিশরের পক্ষে গলা ফাটাচ্ছিলেন। ফুটবলের এই চিরবৈরী দ্বৈরথে তার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ না থাকলেও কেবল একটি মন্তব্য করার জেরে একদল আর্জেন্টিনা সমর্থকের নির্মম পিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয় তাকে।
শুধু শরিফুলই নন, ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর এই তালিকা দিন দিন দীর্ঘই হচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত যে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে তিনজনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া প্রিয় দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বহুতল ভবন থেকে পড়ে কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন তিনজন। আবার প্রিয় দলের খেলা দেখার সময় বা পরাজয়ের ক্ষোভে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছেন কয়েকজন এবং কুষ্টিয়ায় ব্রাজিলের বিদায়ের পর এক ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
অবশ্য বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সময় এমন ট্র্যাজেডি নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে জার্নাল অব ইনজুরি অ্যান্ড ভায়োলেন্স রিসার্চে প্রকাশিত ঢাকার বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন ও জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২২ বিশ্বকাপ চলাকালেও বাংলাদেশে ২৩ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, মৃতদের প্রত্যেকেই ছিলেন পুরুষ এবং তাদের গড় বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর।
গবেষকেরা বলছেন, ভৌগোলিকভাব সুদূর কোনো দেশের জয়-পরাজয়কে তীব্র ব্যক্তিগত আবেগ ও অন্ধ উন্মাদনায় রূপ দেওয়ার ফলেই এই ধরনের ট্র্যাজেডি ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইবার বুলিং ও ট্রল এই উগ্রতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের দেশের ফুটবল যেখানে আন্তর্জাতিক স্তরে অনুজ্জ্বল, সেখানে অন্য দেশের সাফল্য-ব্যর্থতাকে নিজের অস্তিত্বের লড়াই বানিয়ে ফেলার এই সামাজিক ব্যাধি তরুণ সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী সপ্তাহে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে, পতাকাগুলোও নেমে যাবে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন না ঘটলে ফুটবলকে কেন্দ্র করে এই আত্মঘাতী মৃত্যুর মিছিল থামানো অসম্ভব।
তবে সহিংসতা ও মৃত্যুর এই হিড়িক কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বৈশ্বিক উদ্বেগে রূপ নিয়েছে। অন্যতম আয়োজক দেশ মেক্সিকোতে জয় উদ্যাপনের সময় মেক্সিকো সিটির মনুমেন্টের পাশে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড়ে পিষ্ট হয়ে তিনজন এবং খেলা দেখার তীব্র উত্তেজনায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে এক সমর্থক মারা গেছেন।
এছাড়া উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে স্টেডিয়ামের বাইরে ৮১ বছর বয়সী এক জার্মান পর্যটকও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে খেলা দেখার পাবলিক ফ্যান জোনের পাশে গুলি বর্ষণের দুটি পৃথক ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন। স্পেনে মোটর সাইকেলে বসে পতাকা গায়ে জড়িয়ে আনন্দ করার সময় পেছনের চাকায় কাপড় পেঁচিয়ে এক নারী সমর্থক নিহত হন।
আরটিভি/এআর