বুধবার, ২০ মে ২০২৬ , ০৮:৫১ এএম
মহাকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রহস্য। আর সেই রহস্যের অন্যতম হলো মহাকাশের গভীর থেকে আসা অদ্ভুত নীল আলোর ঝলকানি। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই আলোর উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। ২০১৮ সালে প্রথমবার টেলিস্কোপে ধরা পড়ে রহস্যময় এই নীল আলো। এরপর এখন পর্যন্ত একই ধরনের অন্তত ১৪টি তীব্র আলোর স্পন্দন শনাক্ত করা হলেও এর প্রকৃত উৎস নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় লুমিনাস ফাস্ট ব্লু অপটিক্যাল ট্রানজিয়েন্ট (এলএফবিওটি)। এসব আলোর ঝলকানি অত্যন্ত দ্রুত জ্বলে ওঠে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। এগুলোর উজ্জ্বলতা সাধারণ নক্ষত্রের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি হতে পারে। তাই মহাকাশবিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এই ঘটনাকে।
সম্প্রতি একদল বিজ্ঞানী মনে করছেন, একটি ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে অত্যন্ত উত্তপ্ত নক্ষত্রের সংঘর্ষ থেকেই এই নীল আলোর উৎপত্তি হতে পারে। গবেষকদের ধারণা, কোনো ঘন কৃষ্ণগহ্বর যখন একটি বিশাল ওলফ-রায়েট নক্ষত্রের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন সেটি দ্রুত নক্ষত্রের উপাদান গ্রাস করতে শুরু করে। এতে বিপুল পরিমাণ মহাকর্ষীয় শক্তি নির্গত হয় এবং তৈরি হয় শক্তিশালী জেট বা বহিঃপ্রবাহ। এই জেট আশপাশের উপাদানের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে অল্প সময়ের জন্য অত্যন্ত উজ্জ্বল ও উত্তপ্ত নীল আলোর ঝলকানি সৃষ্টি করে।
হার্ভার্ড ও স্মিথসোনিয়ান গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী অ্যানিয়া নুজেন্ট বলেন, এই ঘটনা আগের যেকোনো পর্যবেক্ষণের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর মতে, এলএফবিওটির উৎপত্তির পেছনে অত্যন্ত বিরল ও সহিংস মহাজাগতিক প্রক্রিয়া কাজ করছে।
বিজ্ঞানীরা বর্তমানে যে গ্যালাক্সি থেকে এই নীল আলো এসেছে, সেগুলোর নক্ষত্র গঠনের হার, ভর এবং ধাতব উপাদানের পরিমাণ বিশ্লেষণ করছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তারা এলএফবিওটির সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ব্রায়ান মেটজার জানান, ওলফ-রায়েট নক্ষত্র এলএফবিওটি তৈরির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। কারণ এসব নক্ষত্র আগে থেকেই তাদের বাইরের হাইড্রোজেন স্তর হারিয়ে ফেলে। আর এলএফবিওটির আলোতেও হাইড্রোজেনের উপস্থিতি পাওয়া যায় না, যা এই তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করছে।
আরও একটি বিষয় বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। সাধারণত এসব নীল আলোর ঝলকানি গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে অনেক দূরের নির্জন অঞ্চলে দেখা যায়। ২০২৩ সালে নাসা “দ্য ফিঞ্চ” নামে একটি নীল আলোর সন্ধান পায়, যা তার নিকটবর্তী সর্পিল গ্যালাক্সি থেকে প্রায় ৫০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছিল। আরেকটি এমন আলো গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরে শনাক্ত করা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, যদি এই আলো শুধুমাত্র নক্ষত্র বিস্ফোরণের কারণে সৃষ্টি হতো, তাহলে তা গ্যালাক্সির ঘন কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যেত। কিন্তু বাস্তবে এসব ঘটনা ঘটছে গ্যালাক্সির একেবারে প্রান্তিক অঞ্চলে, যা রহস্যকে আরও গভীর করেছে।
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও নতুন পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে মহাকাশের এই রহস্যময় নীল আলোর প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানা সম্ভব হবে।
সূত্র: ডেইলি মেইল
আরটিভি/এসকে