ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্য থেকে শিক্ষা

সিফাত শাহরিয়ার প্রিয়ান

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ছবি: সংগৃহীত

বাংলা রেনেসাঁর সার্থক প্রতিনিধি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কাব্যগ্রন্থ, প্রহসন, নাটক, পত্রকাব্য, মহাকাব্য, সনেট প্রভৃতি শিল্পাঙ্গিক নিয়ে কাজ করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার ঐতিহাসিক সৃষ্টি মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের প্রথম মাইলফলক ধরা হয় মেঘনাদবধ কাব্যকে। মূলত ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে প্রভাবিত হয়ে মাইকেল এই কাব্যটি রচনা করেন। এটি একটি রূপক বা সাংকেতিক করুণরস প্রদানকারী অমৃতাক্ষর ছন্দে রচিত ইতিহাস আশ্রয়ী মহাকাব্য। কাব্যের কাহিনীতে রামায়ণের মাত্র ৩ দিন ২ রাতের ঘটনা থাকলেও মূলত তাৎপর্য একেবারেই ভিন্ন। এখানে রাম, লক্ষণ ও ঔপনিবেশিক শক্তি হলো ব্রিটিশদের প্রতীক, যারা দখলদার পরাশক্তি। অপরদিকে, রাবণ ও মেঘনাথ এখানে দেশপ্রেমিক। বাঙালি জাতি নিপীড়ন ও বঞ্চিত জনগণের প্রতীক। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’, ডান্ডের ‘ডিজাইন কমেডি’ এবং হোমারের ‘ইলিয়ড ও ওডিসি’ মহাকাব্যকে অনুসরণ ও অনুকরণ করেছেন।

কাব্যের প্রথম স্বর্গে দেখা যায় রাম ও লক্ষণের অতর্কিত আক্রমণে রাবণের এক পুত্র বীরবাহু নিহত হয়। এখানে রাবনের অশ্রুভারাক্রান্ত উক্তি-

‘সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি/বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে/অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি, কোন বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে’

পিতার এই বিপদে দেশ রক্ষার্থে পুত্র মেঘনাদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মেঘনাদের অপর নাম ইন্দ্রজিৎ ও অরিন্দম। মূলত সে মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করত বলেই তার নাম মেঘনাদ। মুখোমুখি যুদ্ধে তাকে পরাজিত করা অসম্ভব জেনে রাম ও লক্ষণ মিলে রাবণের ছোট ভাই বিভীষণের সঙ্গে গোপন চুক্তি সম্পাদন করে। বিভীষণ হবে রাবণের পরবর্তী রাজা, এমন লোভ দেখিয়ে মেঘনাদকে বধ করতে সাহায্যের প্রার্থনা করে তারা। নিরস্ত্র মেঘনাদ যুদ্ধের পূর্বে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্ট দেবীকে তুষ্ট করতে যখন পূজারত ঠিক সেই সময় বিভীষণের সহায়তায় লক্ষণ পেছন থেকে মেঘনাদকে হত্যা করে। যা কাপুরুষতার উদাহরণ। রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে মুখোমুখি যুদ্ধে লক্ষণকেও হত্যা করে। কিন্তু পরবর্তীতে দেবতাদের চক্রান্তে হিমালয়ের সঞ্জীবনী বুটির গুনে লক্ষণ প্রাণ ফিরে পেলেও দেবতারা রাবণ মেঘনাথকে কোনো সাহায্য করেনি।

আরও পড়ুন

মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে এই দেবতাদের পৃথিবীর পরাশক্তির প্রতীক বুঝিয়েছেন। যারা বাইরে সাম্য ও ন্যায়ের কথা বললেও ভেতরে তারা নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। পিতা রাবণ সন্তানের লাশ অশ্রুসিক্ত চোখে চিতায় পুড়িয়ে দেয়। মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলা দেবীও সহমরণ গ্রহণ করেন। মূলত দেশপ্রেমিক ভারতবাসী তথা বাঙালি যুগে যুগে জন্য বিপ্লব করলে বা প্রচণ্ড সাহসিকতার পরিচয় দিলেও শুধু পরাশক্তির চক্রান্তে তা বারবার ব্যাহত হয়েছে। এই বিষয়টি মেঘনাদবধ কাব্যে প্রস্ফুটিত করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

এই কাব্যে থাকা বার্তার প্রাসঙ্গিকতা যে এখনও শেষ হয়নি, তার বড় উদাহরণ বাংলাদেশের বাস্তবতা। বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে জটিল এক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশের ওপর আছে আঞ্চলিক পরাশক্তির প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রভাব। যারা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বকীয়তাকে নিজেদের ছকের বাইরে রাখতে চায় না। তবে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামগুলোতে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে এই সাহসী জাতি দেশপ্রেম তথা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
‘সার্ক-ফোসওয়াল’ আজীবন সম্মাননা পেলেন কবি নূরুল হক
কবিতা, সাহিত্য এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিনিময়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক ‘সার্ক–ফোসওয়াল আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ২০২৬’ (SAARC–FOSWAL Lifetime Achievement Award 2026)-এ ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক নূরুল হক।
‘সার্ক-ফোসওয়াল’ আজীবন সম্মাননা পেলেন কবি নূরুল হক
সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন
সাহসী ও উদ্ভাবনী সাতিহ্যকর্মের জন্য এ বছর নোবেলে পেয়েছেন কানাডার লেখক অ্যান কারসন। সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমসাময়িক সাহিত্যে প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন করে ফুটিয়ে তোলা এবং তার উদ্ভাবনী ও বৈচিত্র্যময় লেখার আধুনিক সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করায় তাকে এ বছর নোবেল দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সুইডিশ একাডেমি।
সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন
নজরুলের দর্শন আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মহৌষধ: মার্কিন গবেষক
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও রাজনৈতিক দর্শনকে আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক খণ্ডন এবং কাঠামোগত নৈতিক অবক্ষয় নিরাময়ের এক চূড়ান্ত রূপরেখা হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রখ্যাত মার্কিন রাজনীতিবিজ্ঞানী ও ইমেরিটাস অধ্যাপক উইনস্টন ই. ল্যাংলি। দীর্ঘ তিন দশকের গভীর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তিনি নজরুলের এই বৈশ্বিক উপযোগিতা তুলে ধরেন।
নজরুলের দর্শন আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মহৌষধ: মার্কিন গবেষক
‘বাংলা একাডেমি ফন্ট’-এর উদ্বোধন
‘তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পের আওতায় প্রস্তুতকৃত ‘বাংলা একাডেমি ফন্ট’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে।
‘বাংলা একাডেমি ফন্ট’-এর উদ্বোধন
বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদ-এর নতুন কমিটি ঘোষণা
বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদ-এর নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সভাপতি শায়লা আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আল জাবের নির্বাচিত হয়েছেন। পরবর্তী দুই বছর অর্থাৎ ২০২৬–২০২৮ মেয়াদে এ নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়।
বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদ-এর নতুন কমিটি ঘোষণা
আরও পড়ুন
মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ