বেপরোয়া ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্র, কারা পড়ছেন এই ফাঁদে

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬ , ০১:০৪ পিএম


বেপরোয়া ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্র, কারা পড়ছেন এই ফাঁদে
প্রতীকী ছবি

বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে শুরু, আর পরিণতিতে ব্ল্যাকমেইল, নির্যাতন কিংবা সর্বস্ব হারানোর মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা—এমন এক কৌশলে দেশজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধী চক্র ‘হানি ট্র্যাপ’। 

প্রেম, চাকরি বা বন্ধুত্বের ছলে টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা হাতানো এবং সামাজিকভাবে হেয় করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে চক্রগুলো। 

রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, এমনকি বিভিন্ন পেশাজীবীরাও প্রতিনিয়ত এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তবে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরদার অভিযানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে চক্রের বহু সদস্যকে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, এসব প্রতারণার কৌশল প্রায় একই ধরনের—সুন্দরী নারীর প্রলোভন, ব্যক্তিগত আপত্তিকর দৃশ্য ধারণ, জোরপূর্বক স্ট্যাম্প ও চেকে সই এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি।

বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি আলোড়ন তোলা কিছু ঘটনা:

টঙ্গীতে প্রেমের ফাঁদ: ১৬ জুন গাজীপুরের টঙ্গীর মুদাফা এলাকায় সালেহীন ও তার বন্ধু টিটুকে প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নেয় একটি চক্র। ঘরে ঢোকার পরপরই তাদের আটকে রেখে মারধর, নগদ ৭৬ হাজার টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে অভিযোগ পেয়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুই নারীসহ চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

চাকরির প্রলোভনে ৪১ লাখ টাকা আত্মসাৎ: দিনাজপুরে কাস্টমস কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয়ে এক গৃহবধূর মাধ্যমে তার স্বামীকে চাকরির লোভ দেখায় তানজিনা নামের এক নারী। ধাপে ধাপে ৪১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ভুক্তভোগীকে ডেকে চোখ বেঁধে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে চক্রটি। পরে ভয় দেখিয়ে চেক ও স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়। গত ২৪ জুলাই এই চক্রের মূলহোতা তানজিনাকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।

রাজধানীতে ঋণ কর্মকর্তাকে ব্ল্যাকমেইল: ৬ জুলাই ঢাকার একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ কর্মকর্তা হানি ট্র্যাপের শিকার হন। সম্পর্কের গভীরতা তৈরির ছলে আপত্তিকর ভিডিও তুলে তা ছড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুই নারীসহ চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

যেভাবে পাতা হয় ফাঁদ ও মূল টার্গেট:

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হানি ট্র্যাপ’ একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতারণা। অপরাধীরা ভুয়া আইডি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ভিডিও কল, ছবি বিনিময় বা সরাসরি দেখা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর গোপনে ধারণ করা ভিডিও বা ছবি ব্যবহার করে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজি।

সাধারণত একাকী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী এবং সামাজিকভাবে পরিচিত বা সচ্ছল মানুষেরা এই চক্রের মূল টার্গেটে থাকেন। সম্প্রতি আশুলিয়া, যাত্রাবাড়ী, নরসিংদী, বরিশাল, রংপুর, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হানি ট্র্যাপ বিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অসংখ্য আসামিকে।

বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের পরামর্শ:

দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা ও সামাজিক অসচেতনতার কারণে অনেকেই সহজে এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং অচেনা বা সন্দেহজনক কোনো লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকার ওপর জোর দেন।

আরও পড়ুন

ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, অপরিচিত কারও সঙ্গে হঠাৎ অতি-ঘনিষ্ঠ না হওয়া, ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও আদান-প্রদান বন্ধ করা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা বজায় রাখাই এই বিপদ থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায়। কোনো ব্যক্তি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইনি সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission