যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ আলোচনায় মিলেছে বড় সাফল্য। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করা হলেও, সরকারের ধারাবাহিক আলোচনার পর তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যমান ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক যোগ হবে।
বিজিএমইএ-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকে কার্যকর শুল্ক হার দাঁড়াচ্ছে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
শুরুতে শুনতে বেশি মনে হলেও বাস্তবতা হলো অন্য দেশগুলোর তুলনায় মোটেও খারাপ অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিযোগী দেশগুলোকে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের বোঝা সামলাতে হচ্ছে, সেখানে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশকে সুবিধাজনক বলেই মনে হয়।
সরকার এবং দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এ নিয়ে বেশ আশাবাদী। বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, ভারত ও চীনের চেয়ে কম। তারা বলছেন যে, নতুন কার্যকর হওয়া শুল্ক হার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে সাহায্য করবে। কারণ, মার্কিন পোশাক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা তুলনামূলক কম শুল্কের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেবে।
মার্কিন শুল্কের সার্বিক বিষয় নিয়ে আরটিভি’র সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মারুফ।
আরটিভি: শুল্কের এই হারকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
শেখ মোহাম্মদ মারুফ: শুল্কের এই হার আমাদের জন্য একটা বড় সাফল্য। তবে অবশ্যই বাড়তি এই শুল্কটা যারা পণ্য রপ্তানি করবে তাদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। তবে এটাও দেখা উচিত এ ট্যাক্সটা শুধু আমরাই দিচ্ছি না, আমাদের প্রতিযোগী বাজারগুলোও সেটা দিচ্ছে। একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া আমাদের প্রতিযোগী যারা যারা আছে সবার জন্য আমাদের থেকেও বেশি ট্যাক্স ধরা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্যদের তুলনায় কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাবো।
আরটিভি: যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কিসের পরিপেক্ষিতে এই ট্যাক্সটা কমাতে বাধ্য বা সম্মত হয়েছে?
শেখ মোহাম্মদ মারুফ: সেটা আমাদেরও অজানা। তবে আমি বিশ্বাস করি, সরকার যে দর কষাকষি করেছে সেখানে এমন কোনো কিছু ছিলো না যেটা আমাদের দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি ও অর্থনীতির জন্য সহায়ক না।
আরটিভি: নতুন ট্যাক্স কার্যকরের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের আধিপত্য কতটা থাকবে বলে আপনি মনে করেন?
শেখ মোহাম্মদ মারুফ: যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে আমরা দ্বিতীয় অবস্থানে আছি, আমাদের আগে ভিয়েতনামের অবস্থান। ভিয়েতনামের রপ্তানি তালিকায় বেশিরভাগই উচ্চমূল্যের সিনথেটিক পোশাক (যেমন—অ্যাকটিভওয়্যার, স্কিওয়্যার)। যেগুলার ট্যাক্স রেট একটু বেশি। এখানে ভিয়েতনাম বলেন আর ইন্ডিয়া বা বাংলাদেশ, এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাইজ টা কিছুটা কম। আমার কাছে মনে হয় এই নতুন ট্যাক্স কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের জিনিসের দাম বাড়বে। যেহেতু সবার জন্য একই ট্যাক্স ধরা হয়েছে সেখানে আমরা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছি।
আরটিভি: ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তৈরি পোশাকে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক মিলিয়ে ভারতের কার্যকর শুল্ক হার এখন ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো সুবিধা পেতে পারে?
শেখ মোহাম্মদ মারুফ: বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব দেশ থেকে আমরা অনেক বিনিয়োগ আশা করতে পারি। কারণ ট্যাক্স বাড়লে বাজার মূল্যও বেড়ে যায়। গতকাল (১০ আগস্ট) কিছু নিউজ দেখেছি, বেশি ট্যাক্সের কারণে বড় বড় কোম্পানিগুলো ভারতে অর্ডার বাতিল করে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে। তাই সেদিক থেকে আমি বিনিয়োগ আশা করতে পারি, যদি এই শুল্কটা বজায় থাকে।
আরটিভি: পোশাক খাতে বাংলাদেশের একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি অনেক গার্মেন্টস আছে যাদের শতভাগই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, সেক্ষেত্রে কোনো কারণে অর্ডার বন্ধ হয়ে গেলে ঝুঁকিতে তারা পড়ে যাবে....
শেখ মোহাম্মদ মারুফ: শুল্ক আরোপের পর আমরা মার্কেটে একটা জরিপ করেছি, যারা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করে, কেউ ৭৫ শতাংশ কেউ ৫৫ শতাংশ। আমরা এটা দেখতে চেয়েছি যে, একটা লোক যদি যুক্তরাষ্ট্রে শতভাগ পোশাক রপ্তানি করে থাকে তাহলে অর্ডার বন্ধ হয়ে গেলে ঝুঁকিতে পড়বে। আমরা তাদের সাথে বসে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। যাতে তারা ভিন্ন কোনো মার্কেট খুঁজে পায় এবং তা কিভাবে করা সম্ভব সেটা নিয়ে আলোচনা করেছি। কেননা শুধুমাত্র একটি দেশের শুল্কের জন্য আমরা যেনো ক্ষতিগ্রস্ত না হই।
আরটিভি: এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য কি পরামর্শ দেবেন আপনি?
শেখ মোহাম্মদ মারুফ: যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের ঘটনার পর আমরা সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, কোনো একটি মার্কেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ঠিক না। ৫ বা ১০ শতাংশ ট্যাক্স ম্যানেজ করা যায় কিন্তু ৫০ বা ৬০ শতাংশ হলে সেটা অনেক কঠিন হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা এ ঘটনার পর একটা শিক্ষা পেয়েছেন। তারাও চেষ্টা করবেন যে, আপনাদের এই ব্যবসার জন্য বিভিন্ন মার্কেট খুঁজে বের করতে হবে। যাতে করে একটা মার্কেটের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
আরটিভি/একে

