দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স পুনর্গঠন বা বাতিল করে সেগুলো অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে খবর দিয়েছে একাধিক গণমাধ্যম।
একই সঙ্গে আইটি ও কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাভিত্তিক বিষয় যুক্ত করার কথা রয়েছে। কলেজ পর্যায়েই ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ চালু, ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন এবং সাতটি বিদেশি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং সব পক্ষের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষাকে সনদনির্ভরতা থেকে বের করে কর্মসংস্থানমুখী করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পাবলিক পরীক্ষার দীর্ঘ সময়সূচি কমানোরও পরিকল্পনা চলছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা যায়, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা এবং পরীক্ষার কর্মদিবস উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এসব পরীক্ষা শেষ হতে ২৫ থেকে ৩৫ কর্মদিবস সময় লাগে, ফলে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত মানসিক চাপের মুখে পড়ে।
নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৮ সাল থেকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ ও ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামের নতুন বিষয় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৭ সালে বিদ্যমান শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করে সংশোধিত সংস্করণ আনা হবে, আর ২০২৮ সালে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন কার্যকর করা হবে।
অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন, দেশের উচ্চশিক্ষাকে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারা থেকে বের করে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী করতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং কর্মবাজারের সঙ্গে শিক্ষার অসামঞ্জস্য দূর করতেই এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যা বলছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়:
অনার্স (স্নাতক সম্মান) পর্যায় থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয় তুলে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিকে সম্পূর্ণ 'ভিত্তিহীন' বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত কর্মকর্তা নূরুল আফসার দীপু এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ বা বিষয় বাতিলের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উচ্চশিক্ষা সংস্কার এবং শিক্ষাক্রম পর্যালোচনার বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে। তবে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে অনার্স শিক্ষা বন্ধ করার কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।
নূরুল আফসার দীপু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক সূত্র থেকে তথ্য নেওয়ার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ২০২৭ সালের শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন শিক্ষাক্রম সংস্কার এবং কয়েকটি নতুন বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে ওই সংস্কার পরিকল্পনার কোথাও অনার্স পর্যায়ে বাংলা, ইতিহাস বা দর্শন বিষয় বাতিলের কোনো ঘোষণা বা প্রস্তাব দেওয়া হয়নি।
আরটিভি/এসকে




