মাসিককালীন স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি

মোনছেফা তৃপ্তি 

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ , ০২:২৯ পিএম


মাসিককালীন স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি
মোনছেফা তৃপ্তি : ফাইল ছবি

শিউলি ক্লাস সিক্সে পড়ে, সে আজ স্কুলে যায়নি। না, তার জ্বর নেই বা পরীক্ষাও ছিল না যে ভয়ে যাবে না। সে স্কুলে যায়নি শুধু মাসিক শুরু হওয়ায়। গ্রামের ছোট্ট স্কুলটিতে আলাদা ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট নেই। পানির ব্যবস্থা নেই। প্রচণ্ড তলপেট ব্যথা। সেইসঙ্গে মাইগ্রেন আর সহপাঠীদের কটূক্তির ভয় তো আছেই। তাই প্রতি মাসে কয়েকটা দিন শিউলির পৃথিবী ছোট হয়ে আসে।

শিউলি একা নয়। বাংলাদেশে হাজারো কিশোরী, নারী ও কর্মজীবী মানুষ এখনো মাসিককে স্বাস্থ্যগত বিষয় হিসেবে নয় বরং লজ্জা, ভয় ও গোপনীয়তার বিষয় হিসেবে বহন করে। অথচ মাসিক নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে ঘিরে আমাদের সমাজে এখনো অসংখ্য কুসংস্কার, সংকোচ ও বৈষম্য রয়ে গেছে।

গত ২৮ মে, বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস উতযাপিত হয়েছে। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো মাসিক নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা, নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং মাসিককে ঘিরে সামাজিক ট্যাবু ভাঙা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে এই দিবসের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এখানে মাসিক স্বাস্থ্য এখনো জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মপরিবেশ ও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের অনেক কিশোরী প্রথম মাসিক সম্পর্কে আগেভাগে কোনো ধারণাই পায় না। ফলে প্রথম অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আতঙ্কের হয়ে ওঠে। অনেক পরিবারে এখনো মাসিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলা নিষিদ্ধ বা অস্বস্তিকর। মেয়েদের বলা হয়, এটা লুকিয়ে রাখতে হয়। কোথাও কোথাও মাসিক চলাকালে রান্নাঘরে যাওয়া, ধর্মীয় কাজে অংশ নেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট খাবার খেতেও নিষেধ করা হয়। এসব সামাজিক ধারণা কিশোরীদের মধ্যে হীনমন্যতা ও অপরাধবোধ তৈরি করে।

অন্যদিকে, নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও সবার নাগালের মধ্যে নেই। নিম্ন আয়ের বহু নারী ও কিশোরী নিয়মিত স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে পারেন না। আবার যারা কোনোভাবে কিনতে পারেন, তাদের অনেকেই উচ্চমূল্যের কারণে প্রয়োজনমতো প্যাড পরিবর্তন করতে পারেন না। অথচ সাধারণভাবে প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর প্যাড পরিবর্তন করা প্রয়োজন। দীর্ঘসময় একই প্যাড ব্যবহার করলে জীবাণু সংক্রমণ, চুলকানি, ত্বকে র‍্যাশ, দুর্গন্ধ ও প্রজননস্বাস্থ্যজনিত বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারী বাধ্য হয়ে দীর্ঘসময় একই প্যাড ব্যবহার করেন, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেকেই অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করেন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো স্যানিটেশন ব্যবস্থা। বাংলাদেশে এখনো বহু স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিত হয়নি। অনেক জায়গায় টয়লেট অপরিচ্ছন্ন, পানির সংকট রয়েছে, নেই পর্যাপ্ত ডিসপোজাল সুবিধা। ফলে মাসিক চলাকালে শিক্ষার্থীরা চরম অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অনেক কিশোরী এই সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে, যা তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শহরাঞ্চলেও নারীবান্ধব পাবলিক টয়লেটের সংকট প্রকট। যে কয়েকটি পাবলিক টয়লেট রয়েছে, তার অনেকগুলোই অস্বাস্থ্যকর, অনিরাপদ কিংবা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ফলে নিম্নআয়ের নারী, পথচলতি নারী শ্রমিক, শিক্ষার্থী কিংবা গণপরিবহন ব্যবহারকারী নারীদের জন্য মাসিককালীন সময়ে বাইরে চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

একইভাবে বহু অফিস, কারখানা ও কর্মস্থলে এখনো নারীদের জন্য আলাদা বা পর্যাপ্ত টয়লেট নেই। কোথাও আবার কাজের চাপ এত বেশি যে নারী কর্মীরা প্রয়োজনমতো টয়লেটে যাওয়ার সুযোগও পান না। বিশেষ করে গার্মেন্টস, সেবা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারীরা মাসিক চলাকালে শারীরিক অস্বস্তি নিয়েই দীর্ঘসময় কাজ করতে বাধ্য হন।

মাসিক বা পিরিয়ডের সময় অনেক নারী বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যান, যা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে তলপেটে তীব্র ব্যথা বা ক্র্যাম্প, কোমর ও পিঠব্যথা, মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের প্রবণতা বৃদ্ধি। অনেকের শরীরে দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দেয়। কারও কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়া, গ্যাস, পেট ফাঁপা বা ক্ষুধামন্দার মতো সমস্যাও হতে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে অনেক নারী অস্বস্তি ও অবসাদ অনুভব করেন। একই সঙ্গে হরমোনের ওঠানামার কারণে ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক অস্থিরতাও দেখা দিতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে এসব শারীরিক কষ্টকে অনেক সময় ‘স্বাভাবিক’ বলে অবহেলা করা হয়, ফলে নারীরা প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, সহানুভূতি বা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন।

মাসিককালীন ছুটির বিষয়টি বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও বাংলাদেশে এখনো এটি নীতিগতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ অনেক নারী তীব্র ব্যথা, দুর্বলতা, মাইগ্রেন, বমিভাব বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়েও নিয়মিত কাজ করতে বাধ্য হন। বিষয়টিকে ‘অজুহাত’ হিসেবে দেখার প্রবণতাও এখনো সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান।

মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাসিকের সময় হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে অনেক নারী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, মুড সুইং, খিটখিটে ভাব বা অবসাদের মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু আমাদের সমাজে এ বিষয়ে সহানুভূতিশীল পরিবেশ খুব কম। বরং অনেক সময় নারীদের ‘অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ’ বা ‘রাগী’ বলে উপহাস করা হয়।

মাসিককালীন সময়ে পুষ্টির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময় শরীরে রক্তক্ষরণ, হরমোনগত পরিবর্তন ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক নারী ও কিশোরী এখনো এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পান না। বরং কিছু পরিবারে মাসিক চলাকালে নির্দিষ্ট খাবার খেতে নিষেধ করা হয়, যা অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়ায়। আবার অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারে এই সময়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের জোগান দেওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ে। 

অন্যদিকে তলপেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, মাথাব্যথা কিংবা মানসিক অস্থিরতার কারণে অনেক নারী ও কিশোরীর স্বাভাবিকভাবে খেতেও সমস্যা হয়। ফলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি, ক্লান্তি ও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অথচ এই সময় শরীরের বাড়তি যত্ন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ সময় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার, শাকসবজি, ডিম, মাছ, ফলমূল ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ জরুরি, যাতে রক্তস্বল্পতা, দুর্বলতা ও ক্লান্তি কমানো যায়। 

আরও পড়ুন

একই সঙ্গে অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত চা-কফি বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস শারীরিক অস্বস্তি বাড়াতে পারে। মাসিককালীন পুষ্টিকে এখনো আমাদের দেশে খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয়, অথচ এটি নারীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে আশার কথাও আছে। 

বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলাদা টয়লেট, ভেন্ডিং মেশিন ও ডিসপোজাল সুবিধা চালু করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন অনেকেই খোলামেলা মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলছেন। তরুণদের অংশগ্রহণও বাড়ছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

আমাদের মূলত প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন। স্কুলের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানভিত্তিক ও বয়সোপযোগী মাসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিসরে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মাসিকবান্ধব টয়লেট নিশ্চিত করতে হবে। স্যানিটারি পণ্যের দাম কমানো এবং দরিদ্র নারীদের জন্য সহজলভ্য করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক যত্ন ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— মাসিককে ‘লজ্জা’ নয়, একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্যগত বিষয় হিসেবে দেখা। মাসিক কোনো ব্যক্তিগত সংকটও নয়; এটি স্বাস্থ্য, মর্যাদা, শিক্ষা ও সমঅধিকারের প্রশ্ন। শিউলিদের স্কুলে ফেরাতে হলে, কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ পরিবেশ দিতে হলে এবং নারীদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, আমাদের সবারই আমাদের সমাজকে নতুন করে সাজাতে হবে।  

লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকার কর্মী 

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission