ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মাসিককালীন স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি

মোনছেফা তৃপ্তি

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
মোনছেফা তৃপ্তি : ফাইল ছবি

শিউলি ক্লাস সিক্সে পড়ে, সে আজ স্কুলে যায়নি। না, তার জ্বর নেই বা পরীক্ষাও ছিল না যে ভয়ে যাবে না। সে স্কুলে যায়নি শুধু মাসিক শুরু হওয়ায়। গ্রামের ছোট্ট স্কুলটিতে আলাদা ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট নেই। পানির ব্যবস্থা নেই। প্রচণ্ড তলপেট ব্যথা। সেইসঙ্গে মাইগ্রেন আর সহপাঠীদের কটূক্তির ভয় তো আছেই। তাই প্রতি মাসে কয়েকটা দিন শিউলির পৃথিবী ছোট হয়ে আসে।

শিউলি একা নয়। বাংলাদেশে হাজারো কিশোরী, নারী ও কর্মজীবী মানুষ এখনো মাসিককে স্বাস্থ্যগত বিষয় হিসেবে নয় বরং লজ্জা, ভয় ও গোপনীয়তার বিষয় হিসেবে বহন করে। অথচ মাসিক নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে ঘিরে আমাদের সমাজে এখনো অসংখ্য কুসংস্কার, সংকোচ ও বৈষম্য রয়ে গেছে।

গত ২৮ মে, বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস উতযাপিত হয়েছে। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো মাসিক নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা, নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং মাসিককে ঘিরে সামাজিক ট্যাবু ভাঙা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে এই দিবসের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এখানে মাসিক স্বাস্থ্য এখনো জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মপরিবেশ ও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের অনেক কিশোরী প্রথম মাসিক সম্পর্কে আগেভাগে কোনো ধারণাই পায় না। ফলে প্রথম অভিজ্ঞতা তাদের কাছে আতঙ্কের হয়ে ওঠে। অনেক পরিবারে এখনো মাসিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলা নিষিদ্ধ বা অস্বস্তিকর। মেয়েদের বলা হয়, এটা লুকিয়ে রাখতে হয়। কোথাও কোথাও মাসিক চলাকালে রান্নাঘরে যাওয়া, ধর্মীয় কাজে অংশ নেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট খাবার খেতেও নিষেধ করা হয়। এসব সামাজিক ধারণা কিশোরীদের মধ্যে হীনমন্যতা ও অপরাধবোধ তৈরি করে।

অন্যদিকে, নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও সবার নাগালের মধ্যে নেই। নিম্ন আয়ের বহু নারী ও কিশোরী নিয়মিত স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে পারেন না। আবার যারা কোনোভাবে কিনতে পারেন, তাদের অনেকেই উচ্চমূল্যের কারণে প্রয়োজনমতো প্যাড পরিবর্তন করতে পারেন না। অথচ সাধারণভাবে প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর প্যাড পরিবর্তন করা প্রয়োজন। দীর্ঘসময় একই প্যাড ব্যবহার করলে জীবাণু সংক্রমণ, চুলকানি, ত্বকে র‍্যাশ, দুর্গন্ধ ও প্রজননস্বাস্থ্যজনিত বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারী বাধ্য হয়ে দীর্ঘসময় একই প্যাড ব্যবহার করেন, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেকেই অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করেন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো স্যানিটেশন ব্যবস্থা। বাংলাদেশে এখনো বহু স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নিশ্চিত হয়নি। অনেক জায়গায় টয়লেট অপরিচ্ছন্ন, পানির সংকট রয়েছে, নেই পর্যাপ্ত ডিসপোজাল সুবিধা। ফলে মাসিক চলাকালে শিক্ষার্থীরা চরম অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অনেক কিশোরী এই সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে, যা তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শহরাঞ্চলেও নারীবান্ধব পাবলিক টয়লেটের সংকট প্রকট। যে কয়েকটি পাবলিক টয়লেট রয়েছে, তার অনেকগুলোই অস্বাস্থ্যকর, অনিরাপদ কিংবা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ফলে নিম্নআয়ের নারী, পথচলতি নারী শ্রমিক, শিক্ষার্থী কিংবা গণপরিবহন ব্যবহারকারী নারীদের জন্য মাসিককালীন সময়ে বাইরে চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

একইভাবে বহু অফিস, কারখানা ও কর্মস্থলে এখনো নারীদের জন্য আলাদা বা পর্যাপ্ত টয়লেট নেই। কোথাও আবার কাজের চাপ এত বেশি যে নারী কর্মীরা প্রয়োজনমতো টয়লেটে যাওয়ার সুযোগও পান না। বিশেষ করে গার্মেন্টস, সেবা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারীরা মাসিক চলাকালে শারীরিক অস্বস্তি নিয়েই দীর্ঘসময় কাজ করতে বাধ্য হন।

মাসিক বা পিরিয়ডের সময় অনেক নারী বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যান, যা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে তলপেটে তীব্র ব্যথা বা ক্র্যাম্প, কোমর ও পিঠব্যথা, মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের প্রবণতা বৃদ্ধি। অনেকের শরীরে দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা বমি বমি ভাব দেখা দেয়। কারও কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়া, গ্যাস, পেট ফাঁপা বা ক্ষুধামন্দার মতো সমস্যাও হতে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে অনেক নারী অস্বস্তি ও অবসাদ অনুভব করেন। একই সঙ্গে হরমোনের ওঠানামার কারণে ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক অস্থিরতাও দেখা দিতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে এসব শারীরিক কষ্টকে অনেক সময় ‘স্বাভাবিক’ বলে অবহেলা করা হয়, ফলে নারীরা প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, সহানুভূতি বা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন।

মাসিককালীন ছুটির বিষয়টি বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও বাংলাদেশে এখনো এটি নীতিগতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ অনেক নারী তীব্র ব্যথা, দুর্বলতা, মাইগ্রেন, বমিভাব বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়েও নিয়মিত কাজ করতে বাধ্য হন। বিষয়টিকে ‘অজুহাত’ হিসেবে দেখার প্রবণতাও এখনো সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান।

মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাসিকের সময় হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে অনেক নারী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, মুড সুইং, খিটখিটে ভাব বা অবসাদের মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু আমাদের সমাজে এ বিষয়ে সহানুভূতিশীল পরিবেশ খুব কম। বরং অনেক সময় নারীদের ‘অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ’ বা ‘রাগী’ বলে উপহাস করা হয়।

মাসিককালীন সময়ে পুষ্টির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময় শরীরে রক্তক্ষরণ, হরমোনগত পরিবর্তন ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক নারী ও কিশোরী এখনো এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পান না। বরং কিছু পরিবারে মাসিক চলাকালে নির্দিষ্ট খাবার খেতে নিষেধ করা হয়, যা অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়ায়। আবার অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারে এই সময়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের জোগান দেওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে তলপেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, মাথাব্যথা কিংবা মানসিক অস্থিরতার কারণে অনেক নারী ও কিশোরীর স্বাভাবিকভাবে খেতেও সমস্যা হয়। ফলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি, ক্লান্তি ও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অথচ এই সময় শরীরের বাড়তি যত্ন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ সময় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার, শাকসবজি, ডিম, মাছ, ফলমূল ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ জরুরি, যাতে রক্তস্বল্পতা, দুর্বলতা ও ক্লান্তি কমানো যায়।

আরও পড়ুন

একই সঙ্গে অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত চা-কফি বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস শারীরিক অস্বস্তি বাড়াতে পারে। মাসিককালীন পুষ্টিকে এখনো আমাদের দেশে খুব কম গুরুত্ব দেওয়া হয়, অথচ এটি নারীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে আশার কথাও আছে।

বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলাদা টয়লেট, ভেন্ডিং মেশিন ও ডিসপোজাল সুবিধা চালু করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন অনেকেই খোলামেলা মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলছেন। তরুণদের অংশগ্রহণও বাড়ছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

আমাদের মূলত প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন। স্কুলের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানভিত্তিক ও বয়সোপযোগী মাসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিসরে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মাসিকবান্ধব টয়লেট নিশ্চিত করতে হবে। স্যানিটারি পণ্যের দাম কমানো এবং দরিদ্র নারীদের জন্য সহজলভ্য করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক যত্ন ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— মাসিককে ‘লজ্জা’ নয়, একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্যগত বিষয় হিসেবে দেখা। মাসিক কোনো ব্যক্তিগত সংকটও নয়; এটি স্বাস্থ্য, মর্যাদা, শিক্ষা ও সমঅধিকারের প্রশ্ন। শিউলিদের স্কুলে ফেরাতে হলে, কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ পরিবেশ দিতে হলে এবং নারীদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, আমাদের সবারই আমাদের সমাজকে নতুন করে সাজাতে হবে।

লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকার কর্মী

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
আজ মহান শিক্ষক দিবস। জীবনের এই বিশেষ দিনে সবার আগে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার জীবনের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক—আমার আম্মুকে। আমার জীবনের প্রতিটি ভালো অর্জনের পেছনে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তার ভালোবাসা, শাসন, ত্যাগ ও নিরন্তর অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। এরপর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার স্কুলজীবনের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের—প্রধান শিক্ষক দীন ইসলাম স্যার, ফরিদা ইয়াসমিন (আমার চাচি), নিপা মেম, হেলানা মেম ও ফাতেমা মেমকে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্নেহেই চতুর্থ শ্রেণিতে আমার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করেছিল। তাদের শেখানো অনেক কথাই আজও আমার পথচলার অনুপ্রেরণা। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যখন মাধ্যমিক জীবনে পা রাখলাম, তখন নতুন করে কিছু মানুষ আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাদের স্নেহ, শাসন ও অনুপ্রেরণায় পেয়েছি নতুন পথের সন্ধান। তাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক রেহানা মেম, শিলা মেম, তানিয়া মেম, দোলা মেম, হুজুর স্যার ও রাসেল স্যার অন্যতম। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেয়েছি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এরপর এলো কলেজজীবন। জীবনের এই অধ্যায়েও কিছু মানুষ আমার স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলেছেন। রাবেয়া মেম, দীপ্তি মেম, শামীম স্যার, দেলোয়ার স্যার ও আবুবকর স্যার—তাদের নাম আমি কখনোই ভুলতে পারব না। তারা আমাকে শুধু পড়াননি; বরং স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন এবং বিশ্বাস করিয়েছেন—‘আমি পারব।’ তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ফলেই আজ আমি দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তাদের অনুপ্রেরণায়ই ঢাবিতে (কলা অনুষদের নরমাল সাবজেক্টে), রাবি ও চবিতে ভর্তির সুযোগ হয়েছিল। আমার জীবনের সেই সময়ে তাদের উৎসাহ ও বিশ্বাস আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পথচলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদানও আমি কখনো ভুলব না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের যে স্নেহ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা—তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, বরং জীবনকে কীভাবে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে হয়, সেটিও শেখার সুযোগ পাচ্ছি। শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের বাইরেও আমার জীবনে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে আমার চাচাতো বড় বোন মিম আপুর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে অনেক অঙ্ক অনুশীলন করিয়েছেন। তার সেই পরিশ্রম ও সময় দেওয়ার সুফল আমি আজও পাচ্ছি। অনেক সময় একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে থাকেন না, কিন্তু তার শেখানোটা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়—মিম আপু আমার জন্য তেমনই একজন। এর পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা আমার শেখার জগৎকে আরও বিস্তৃত করেছে। সাংবাদিকতা করার সুবাদে আরটিভির অনলাইন ইনচার্জ আজাদ ভাই এবং শিফট ইনচার্জ ইমতিয়াজ ভাইয়ের কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। সংবাদকে কীভাবে দেখতে হয়, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতা— এসব বিষয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাদের প্রতিও রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো শিক্ষক আমার হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন। কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে কঠিন সময়ে হাল না ছেড়ে এগিয়ে যেতে হয়, আবার কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রেখে আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। আজ আমি যে পরিচয়ে পরিচিত, তার পেছনে আমার বাবা-মায়ের পাশাপাশি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের দেওয়া শিক্ষা, শাসন, স্নেহ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। আমার জীবনের পথচলায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রত্যেকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা। শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; একজন শিক্ষক একটি জীবন বদলে দিতে পারেন। আর জীবনের এই দীর্ঘ পথে কিছু মানুষ শিক্ষক না হয়েও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যান। তাই এই মহান দিবসে আমার শিক্ষকদেরসহ বিশ্বের সকল শিক্ষকের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা। শুভ শিক্ষক দিবস। আবুবকর সম্পদ জবি সংবাদদাতা, আরটিভি আহ্বায়ক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি আরটিভি/এমএইচজে
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থ, সময়, মানসিক চাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসা নিয়ে প্রত্যাশা। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার কাছে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়—দ্বিতীয় মতামত নেওয়া। দ্বিতীয় মতামত মানে প্রথম চিকিৎসককে অবিশ্বাস করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিকিৎসা সিদ্ধান্তের আগে আরেকজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত জানা। এতে রোগী ও পরিবার রোগের অবস্থা, চিকিৎসার বিকল্প, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দেশে বা বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন। আমাদের দেশে কোনো জটিল রোগ ধরা পড়লেই অনেক পরিবার প্রথমে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবেন। আবার কেউ পরিচিত কারও অভিজ্ঞতাকে নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্তের ভিত্তি করেন। কিন্তু একই রোগ হলেও প্রতিটি রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং ঝুঁকি এক নয়। তাই একজনের ভালো অভিজ্ঞতা অন্যজনের জন্য একই ফল নিশ্চিত করে না। আমার দৃষ্টিতে, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?” এর উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় জানা দরকার। রোগটি ঠিক কী? চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী? দেশে এই চিকিৎসার উপযুক্ত সক্ষমতা আছে কি না? বিদেশে গেলে অতিরিক্ত কী সুবিধা পাওয়া যাবে? সম্ভাব্য খরচ কত? আর চিকিৎসার পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ কীভাবে হবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং চিকিৎসক ও রোগীর যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে। চিকিৎসার মান শুধু একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে না; নিরাপত্তা, রোগীকেন্দ্রিকতা, সময়োপযোগিতা এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে একটি চিকিৎসা করিয়ে দেশে ফিরে আসার পর পরবর্তী চিকিৎসা কোথায় হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কোথায় হবে এবং চিকিৎসার তথ্য স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে—এসবও সিদ্ধান্তের অংশ হওয়া উচিত। কারণ চিকিৎসা একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া মানেই চিকিৎসা পরিবর্তন করতে হবে—এমন নয়। অনেক সময় দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের মতামত প্রথম চিকিৎসা পরিকল্পনাকেই আরও পরিষ্কার করে। আবার কখনো নতুন কোনো বিকল্প সামনে আসতে পারে। মূল বিষয় হলো—রোগী যেন নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া ভুল—এমন কথা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিদেশে গেলেই ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেক চিকিৎসার জন্য দেশের মধ্যেই উপযুক্ত সক্ষমতা থাকতে পারে। তাই আমার কাছে বিদেশে চিকিৎসার প্রশ্নটি “দেশ না বিদেশ”—এভাবে দেখার চেয়ে “প্রয়োজনের জন্য সঠিক জায়গা কোথায়?”—এই প্রশ্নে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীকে কোনো একটি সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় না। বরং তাকে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় বিকল্প এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত রোগী বিদেশে যাবেন, নাকি দেশে চিকিৎসা নেবেন—সিদ্ধান্তটি তার। আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট তথ্য ও আস্থার সুযোগ দেওয়া। কারণ চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কখনো কখনো আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত শুধু একটি অতিরিক্ত পরামর্শ নয়— এটি হতে পারে আরও সচেতন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম। আরটিভি/ এসকেডি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
আদালতের একটি তারিখ মানে অনেকের জীবনে আরেকটি অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা কখনো জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার, কখনো পাওনা টাকা আদায়ের, কখনো অপরাধের বিচার পাওয়ার, আবার কখনো নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার। আদালতের নথিতে এসব কেবল মামলা নম্বর ও পক্ষের নাম কিন্তু প্রতিটি মামলার পেছনে থাকে মানুষের জীবনের একটি করে গল্প। বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা যখন ৪৬ লাখ ছাড়িয়ে যায়, তখন এটিকে শুধু বিচার বিভাগের ওপর জমে থাকা কাজের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সব স্তরের আদালতে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা অধস্তন আদালতেই। এত বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। তবে মামলার সংখ্যা দিয়েই পুরো বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা মাপা যায় না। মামলা বাড়ার পেছনে যেমন নতুন বিরোধের সৃষ্টি আছে, তেমনি আছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সাক্ষ্য ও নথি ব্যবস্থাপনার সমস্যা, মুলতবি এবং আপিলের মতো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘মামলা এত বেশি কেন’ নয়। বরং আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে এত সময় লাগে কেন এবং সেই অপেক্ষার মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেন? ৩১ মার্চ ২০২৬-এর হিসাবটি দেখলে সমস্যার ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়। আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি এবং অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৮৮ শতাংশই অধস্তন আদালতে। অধস্তন আদালতের এই চাপের মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি এবং ফৌজদারি মামলা ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি। এখানে বিচারকের সংখ্যা ও আদালতের সক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন নতুন সিভিল জজ নিয়োগসহ আদালতের সহায়ক জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। নতুন আদালত ও বিচারকের পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই মামলার জট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি মামলার নিষ্পত্তির সঙ্গে বিচারকের পাশাপাশি যুক্ত থাকে আদালতের প্রশাসন, সমন জারি, সাক্ষীর উপস্থিতি, তদন্ত, নথি প্রস্তুত, আইনজীবী ও পক্ষগুলোর প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা। এসব জায়গার কোনো একটিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো মামলার ওপর। তাই মামলার জটকে শুধু বিচারকের স্বল্পতার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি অংশই দেখা হবে। বিচারের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব সংবিধানও স্বীকার করেছে। সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্বকে শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও নির্দিষ্ট মামলার বিচার শেষ করার সময়সীমা রয়েছে। ৩৩৯সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার গ্রহণের পর ১৮০ দিনের মধ্যে এবং সেশনস জজ, অতিরিক্ত সেশনস জজ বা সহকারী সেশনস জজের আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে, নির্দিষ্ট শর্তে জামিনের সুযোগের কথাও একই ধারায় বলা হয়েছে। তবে আইনে সময়সীমা নির্ধারিত থাকা আর বাস্তবে প্রতিটি মামলা সেই সময়ের মধ্যে শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। মামলার প্রকৃতি, সাক্ষী, আসামির অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। মামলার জট কমানোর ক্ষেত্রে তাই আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার গুরুত্বও বাড়ছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯এ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, উপযুক্ত বিরোধ যেন সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে না হয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন এসেছে আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০২৫ সনের ৩৫ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ ২১খ, ২১গ, ২১ঘ ও ২১ঙ ধারা সংযোজন করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের বিরোধে আদালতে মামলা করার আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ১২টি জেলায় চালুর পর ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ তা আরও জেলায় সম্প্রসারিত হয়। সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে। মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যকর হলে কিছু বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তির সুযোগ পাবে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ, সহজলভ্য ও কার্যকর হয় তার ওপর। বিশেষ করে আর্থিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল কোনো পক্ষ যেন মধ্যস্থতার নামে আপস করতে বাধ্য না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্য বিচারপ্রাপ্তির পথ সংকুচিত করা নয়; বরং উপযুক্ত ক্ষেত্রে দ্রুত ও কম খরচে বিরোধের সমাধানের সুযোগ তৈরি করা। প্রযুক্তিও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমন জারি, মামলার নথি ব্যবস্থাপনা, মামলার তারিখ ও কার্যক্রম সম্পর্কে পক্ষগুলোকে দ্রুত জানানো এবং আদালতের প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল করা গেলে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রযুক্তি কোনো জাদুকাঠি নয়। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই মামলার জট কমে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মামলা ব্যবস্থাপনা। কোন মামলা কত পুরোনো, কোন মামলায় কতবার সময় নেওয়া হয়েছে, কোন মামলায় সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, কোন মামলায় রায় অপেক্ষমাণ, এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। পুরোনো মামলাগুলোর জন্য আলাদা নজরদারি এবং নিয়মিত পর্যালোচনাও প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ দেখা গেছে হাইকোর্ট বিভাগে। ১০ জুলাই ২০২৫ প্রধান বিচারপতি ২০০০ সালের আগে দায়ের করা ১০ হাজার ৩৮৫টি পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে মামলার জট কমানোর আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। একজন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই, ন্যায্য শুনানি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন রেখেই বিচারকে সময়োপযোগী করতে হবে। অন্যদিকে বছরের পর বছর একটি মামলাকে ঝুলিয়ে রাখাও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারব্যবস্থার জন্য আসল চ্যালেঞ্জ তাই দ্রুততা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। মামলা কমানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মামলার সংখ্যা কমানো নিজে কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়। কোনো নাগরিকের বৈধ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় মামলা, অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কমানো; আদালতে যাওয়ার অধিকার সীমিত করা নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য কার্যকর আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা বিচারপ্রাপ্তির সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ৪৬ লাখের বেশি বিচারাধীন মামলা তাই শুধু আদালতের ভেতরের একটি সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রের বিচারপ্রাপ্তির সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। নতুন বিচারক ও আদালত যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষ আদালত প্রশাসন, কার্যকর মামলা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার প্রসার। একই সঙ্গে প্রতিটি সংস্কারের ফলও পরিমাপ করতে হবে। কত মামলা কমল, কত সময় সাশ্রয় হলো, বিচারপ্রার্থীর খরচ কতটা কমল এবং কত দ্রুত কার্যকর প্রতিকার পাওয়া গেল, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো সংস্কারের সাফল্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। শেষ পর্যন্ত আদালতের নথিতে একটি মামলা একটি সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু বিচারপ্রার্থীর কাছে সেটি তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের শেষ কখন হবে, তা অনিশ্চিত হয়ে গেলে বিচার পাওয়ার অধিকার কাগজে থাকলেও তার বাস্তব মূল্য কমে যায়। তাই বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু মামলার সংখ্যা কমানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যেতে পারবেন এবং অযথা দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই আইনসম্মত ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ৪৬ লাখ মামলার পরিসংখ্যান আমাদের সেই প্রশ্নটিই সামনে এনে দেয়, আদালতের দরজা খোলা আছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা একজন মানুষ ন্যায়বিচারের কাছে পৌঁছাতে আর কতটা পথ পাড়ি দেবেন? লেখা: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি শিক্ষানবিশ আইনজীবী।  আরটিভি/এসকে
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার এক তাৎপর্যপূর্ণ, সময়োপযোগী ও ভারসাম্যের প্রতিফলন। 
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
আরও পড়ুন
কিশোরীকে তুলে নিয়ে গেলেন সাঈদ, এসপির শরণাপন্ন বাবা
প্রেমিকাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে ৪ বন্ধু মিলে রাতভর ধর্ষণ, অতঃপর...
গ্রাম্য সালিশে নির্ধারণ করা হলো কিশোরীর ‘ইজ্জতের মূল্য’
কিশোরীকে নিয়ে পরিত্যক্ত দোকানে রফিকুল, আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান স্বজনরা