করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে যখন সন্তান ফেলে যেতো বাবা-মায়ের মরদেহ। ঠিক সে সময় থেকে ওই লাশগুলোকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় শেষ বিদায় জানাতে নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটিদল সঙ্গে করে মাঠে নেমে পড়েছিলেন সঞ্জীবনী। তিনি মূলত একজন ট্রান্সজেন্ডার বা লিঙ্গরূপান্তরিত নারী। এই সঞ্জীবনী মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান - এই চার ধর্মের অনুসারীদের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় কী কী মানতে হয়, তা শিখেছেন। ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী কখনো মরদেহ নিয়ে চলে যাচ্ছেন কবরস্থানে, আবার কখনো চলে যাচ্ছেন শ্মশান কিংবা গ্রেইভইয়ার্ডে (খ্রিস্টানদের কবর)।
তিনি ২০২০ সালের মে মাস থেকে প্রশংসনীয় কর্মে যুক্ত রয়েছেন। ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির সৎকারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি ও তাদের সহযোগীরা। মৃতদের স্বজন থাকলে তাদের সঙ্গে কথা বলাসহ পুরো কাজের সমন্বয় এই সঞ্জীবনীই করছেন। দলের সদস্য হিসেবে লাশের গোসল, দাফনসহ অন্যান্য কাজেও হাত লাগাতে হয় এ কাজে যুক্ত থাকা ট্রান্সজেন্ডার মানুষটাকে।
সঞ্জীবনীর পরিচয়:
সঞ্জীবনীর আরেক নাম সজীব সতেজ। এরও আগে তার নাম ছিল আশিকুল ইসলাম। শারিরীক ভিন্নতার কারণে জীবনের বেশির ভাগ সময়ই মানুষের কাছ থেকে বিরূপ আচরণ পেয়েছেন এই মানুষটা। তবে, মৃতদের কবর ও সৎকারের কাজে যুক্ত হওয়ায় অনেক সম্মান পাচ্ছেন তিনি। কেবল তা’ই নয়, মানুষের ভালোবাসাতেও সিক্ত হচ্ছে তিনি।
ছোটবেলা থেকেই নাচ শেখেন টাঙ্গাইলের সন্তান সঞ্জীবনী। পরে তিনি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন পরিচালিত বান্দরবানের লামায় স্কুলের নাচের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে নিজে আগ্রহ করে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ সৎকারে এগিয়ে আসেন তিনি। চট্টগ্রামে কিছুদিন কাজ করার পর থেকে তিনি ঢাকায় কাজ করছেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ক্যাম্পে থেকে কাজ করছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে কোথায় করোনায় রোগী মারা গেছেন, সে তথ্য পেয়ে সঞ্জীবনী তার দলের সদস্যদের নিয়ে হাসপাতালে যান। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন লাশের কাছে যেতে ভয় পেতেন। তাই লাশের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার পুরো কাজটিই করতে হতো সঞ্জীবনী ও তার দলের সদস্যদের।
পড়াশোনা ও কর্মজীবন:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করে তিনি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে নাচের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। নাচের শিক্ষক হিসেবে যে বেতন পেতেন, এখনও তা পাচ্ছেন তিনি। আর মরদেহ দাফন-কাফনের কাজটি করছেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে।
সঞ্জীবনী নিজেকে নারী মনে করলেও বর্তমানে তিনি পুরুষ দলের দলনেতা হিসেবে কাজ করছেন। পুরুষদের মরদেহ দাফন-কাফনে সহায়তা করছেন। তিনি বলেন, ‘এ দলে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য নির্দিষ্ট ড্রেস কোড আছে। এ কাজ করতে গিয়ে মৃতের স্বজন বা অন্য মানুষদের কাছ থেকে কোনো বিরূপ মন্তব্য শুনতে হচ্ছে না। কাজ করতে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতাও নেই। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কর্মীদের সুস্থ থাকার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ নজর দেওয়া হচ্ছে।’
সঞ্জীবনী আরও বলেন, ‘কখন কে মারা যাবেন বা কখন ডাক পড়বে, তার কোনো ঠিক নেই। তাই সেই অর্থে আমার কোনো অবসর নেই। সব সময়ই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হয়। সুরক্ষিত পোশাক পিপিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কাজগুলো করতে হয় আমাদের।’
নাজেহাল হতে হতো তাকে:
সঞ্জীবনী নিজেকে নারী মনে করলেও বর্তমানে তিনি পুরুষ দলের দলনেতা হিসেবে কাজ করছেন। পুরুষদের লাশ দাফন-কাফনে সহায়তা করছেন। তিনি বলেন, ‘এ দলে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য নির্দিষ্ট ড্রেস কোড আছে। এ কাজ করতে গিয়ে মৃতের স্বজন বা অন্য মানুষদের কাছ থেকে কোনো বিরূপ মন্তব্য শুনতে হচ্ছে না। কাজ করতে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতাও নেই। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কর্মীদের সুস্থ থাকার বিষয়টিতে সর্বোচ্চ নজর দেওয়া হচ্ছে।’
সঞ্জীবনী আরও বলেন, ‘এইচএসসি পড়া পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গেই ছিলাম। কিন্তু মানুষ যে শুধু আমার সঙ্গেই খারাপ ব্যবহার করত তা তো নয়, সুযোগ পেলেই আমার পরিবারের সদস্যদের খারাপ কথা শুনিয়ে দিত। আমাকে তারা নানাভাবে নাজেহাল করত। একসময় বাধ্য হয়ে প্রায় ৮ বছর আগে বাড়ি ছাড়ি আমি। একমাত্র বোন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আমি পড়াশোনার জন্য আর্থিক সহায়তাও পেয়েছি পরিবারের কাছ থেকে। এখন মানুষের নাজেহালের ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারছি না। কারও সঙ্গে দেখাও করতে পারছি না।’
যে কারণে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন সঞ্জীবনী:
সঞ্জীবনী লাশ দাফন-কাফনের যে কাজটি করার সুযোগ পেয়েছেন, তাকে সৌভাগ্য হিসেবেই মনে করছেন। ট্রান্সজেন্ডার নারী হয়েও তিনি যে এক বছর ধরে কাজটি করতে পারছেন, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত কতটি লাশের শেষ বিদায়ে সহায়তা করতে পারলাম, সে সংখ্যা বা হিসাবটি আমার কাছে আছে। তবে আমার কাছে সংখ্যার চেয়েও কাজটি সব থেকে বড়। মমতার স্পর্শে শেষ বিদায় দিতে চাই সবাইকে।’
কেএফ
আরটিভি’র সর্বশেষ নিউজ পেতে ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন...
