অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের অভিভাবকত্ব কে পাবেন? আইনি পর্যালোচনা

শহীদুজ্জামান সেতু

বুধবার, ২৫ জুন ২০২৫ , ০৪:২৫ পিএম


অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের অভিভাবকত্ব কে পাবেন?
ছবি: সংগৃহীত

নাবালক সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মার বিষয়টি সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা অবস্থায় উত্থাপিত হয় না। কারন স্বাভাবিক সম্পর্কের মাঝে নাবালকের বিষয়ে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পিতা-মাতা যৌথ আলোচনা এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকেন। সাধারণত সমস্যার সূত্রপাত হয় নাবালকের পিতা-মাতার মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ সংঘটিত হলে অথবা পিতার মৃত্যু হলে। 

আমাদের দেশে নাবালকের অভিভাবকত্ব ও জিম্মার ক্ষেত্রে দুইটি আইন কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। এর একটি হলো ‘ব্যক্তিগত আইন’ অর্থাৎ নাবালক যে ধর্মের অনুসারী সেই ধর্মের নিয়ম অনুসারে তার অভিভাবক কে হবেন তার জিম্মার ক্ষেত্রে কার অধিকার থাকবে তা নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য মুসলিম ব্যক্তিগত আইন ‘শরিয়ত প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে এই ব্যক্তিগত আইনের উপরোক্ত বিষয়কে আদালতের মাধ্যমে প্রায়োগিক রূপদান করার জন্য যে আইন ব্যবহৃত হয় তা হল ‘অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৮০।’ 

তবে এই দুই আইনের মধ্যে কোনরূপ বিরোধ দেখা দিলে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকে প্রাধান্য দিতে হবে শুধুমাত্র একটি ব্যতিক্রম ছাড়া আর তা হল ‘নাবালকের সর্বোত্তম কল্যান পলিসি’ অর্থাৎ, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে যা কিছুই থাকুকনা কেন আদালত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন নাবালকের সর্বোত্তম কল্যানের কথা চিন্তাকরে। 

নাবালকের অভিভাবকত্ব ও জিম্মা দুটি আলাদা বিষয় হলেও অনেকেই অভিভাবকত্ব ও জিম্মা বিষয় দুটিকে এক ভেবে গুলিয়ে ফেলেন। পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে অভিভাবকত্ব ও জিম্মা বিষয় দুইটিকে আমি দুইটি আলাদা খণ্ডে  ব্যাখা করব। 

নাবালকের অভিভাবকত্ব ও তার আইনি বিশ্লেষণ 
মুসলিম শরিয়া আইন অনুযায়ী নাবালকের আইনগত অভিভাবক হচ্ছেন তার বাবা, বাবার অনুপস্থিতিতে বাবার দিকের পুরুষ আত্মীয়গণ যেমন—দাদা, ভাই, চাচা। অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে উপরোক্ত আত্মীয়গণ সব সময় মায়ের উপরে স্থান পায়, তবে বাবা যদি তার সন্তানের অভিভাবকত্ব তার স্ত্রীর উপর ‘ওসিয়ত’ করে যান সেই ক্ষেত্রে মা অন্যান্য পুরুষ জ্ঞাতিগনকে বাদ দিয়ে অভিভাবকত্ব লাভ করবেন। তাছাড়া বিশেষ ক্ষেত্রে আদালত মাকে অন্যান্য সকল জ্ঞাতিপুরুষদের বাদ দিয়ে অভিভাবক নির্বাচন করতে পারেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আদালতকে অবশ্যই দেখাতে হবে যে, উক্ত অভিভাবক নিয়োগ আদালত নাবালকের সর্বোচ্চ কল্যানের স্বার্থে করেছেন। এই দুই পন্থার বাইরে মায়ের অভিভাবকত্ব লাভ করার কোন সুযোগ নাই। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে স্বাভাবিক ক্ষেত্রে পিতা বেঁচে থাকলে আদালত অন্য কাউকে নাবালকের অভিভাবক নিয়োগ করবেন না।

অভিভাবকের প্রকারভেদ: 
অভিভাবকত্ব মূলত তিন ধরনের। যথা—
১. ব্যক্তির অভিভাবকত্ব।
২. সম্পত্তির অভিভাবকত্ব।
৩. ব্যক্তি ও সম্পত্তি উভয়ের অভিভাবকত্ব। 

setu

ব্যক্তির অভিভাবকত্ব
ব্যক্তির অভিভাবকত্ব বলতে নাবালকের সকল ব্যক্তিগত বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে বুঝায়। এই ধরনের অভিভাবক নাবালকের ব্যক্তিগত যাবতীয় সিদ্ধান্ত যেমন- নাবালকের পড়াশোনা, বিয়ে এভং নাবালক কর্তৃক নাবাবিধ চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এই ধরনের অভিভাবকত্বের অধিকার সাধারনত পিতার অধিকারভুক্ত হয়ে থাকে। পিতার অবর্তমানে এই অধিকার মায়ের কাছে নয় বরং বাবার দিকের পুরুষ জ্ঞাতিগণর ওপর বর্তায়। অর্থাৎ পিতার অবর্তমানে এই অধিকার পাবেন দাদা, দাদার অবর্তমানে বড় ভাই, ভাই এর অবর্তমানে চাচা। অতএব, যদি কোন ব্যক্তি নাবালক সন্তান, বিধাব স্ত্রী এবং ভাই রেখে মৃত্যুবরন করেন তাহলে মৃত ব্যক্তির ভাই অর্থাৎ নাবালকের চাচাই হবেন নাবালকের অভিভাবক এই ক্ষেত্রে মা অভিভাবকত্ব লাভ করবেন না।

সম্পত্তির অভিভাবকত্ব
সম্পত্তির অভিভাবকত্ব বলতে নাবালকের সম্পত্তি সর্ম্পকিত যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহন করার ক্ষমতাকে বুঝায়। উদাহরন স্বরূপ বলা যায় নাবালকের জন্য কোন সম্পত্তি ক্রয় করার সিদ্ধান্ত অথবা বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করার ক্ষমতা সম্পত্তির অভিভাবকত্ব অর্জন করা ব্যক্তির উপর বর্তায়। তবে এই অধিকার নিশর্ত নয়। নাবালকের কোন সম্পত্তি বিক্রয় করার ক্ষেত্রে সম্পত্তির অভিভাবককে অবশ্যই নিম্নলিখত কোন একটি কারনে তা বিক্রি করা প্রয়োজন বলে প্রমাণ করতে হবে। যথা—
১.    নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করে দ্বিগুন মূল্য পাওয়া সম্ভব। 
২.    নাবালকের ভরনপোষনের জন্য। 
৩.    মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের অন্য কোন উপায় না থাকলে। 
৪.    ব্যয়ের পরিমাণ সম্পত্তির আয়ের অধিক হলে। 
৫.    সম্পত্তিটি ধ্বংস বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে এমন অবস্থায়। 
৬.    সম্পত্তিটি অন্যায়ভাবে গ্রাস হয়ে গেলে এবং পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম থাকলে। 

নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবকত্বের অধিকার পিতা, দাদা, পিতা ও দাদা কর্তৃক ওসিয়তকৃত ব্যক্তি এবং আদালত কর্তৃক নিয়োগকৃত ব্যক্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ পিতার জীবিত থাকা অবস্থায় পিতাই হবেন নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক। পিতার অবর্তমানে দাদা হবেন উক্ত সম্পত্তির অভিভাবক। কিন্তু পিতা ও দাদার অবর্তমানে অন্য কোন পুরুষ জ্ঞাতিগনের উপর নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবকত্বের অধিকার বর্তাইবে না। তবে পিতা কিংবা দাদা ওসিয়তের মাধ্যমে যদি কাউকে অভিভাবক নিযুক্ত করেন সেক্ষেত্রে তিনিই হবেন নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক। কিন্তু এই ধরনের ওসিয়তের অনুপস্থিতিতে এই অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারও উপর বর্তাবে না এই ক্ষেত্রে আদালত কর্তৃক নিয়োগকৃত ব্যক্তিই হবেন সম্পত্তির অভিভাবক অর্থাৎ পিতা এবং দাদার পর এই অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য কারও উপর বর্তাইবে না। যদিও আমাদের দেশে এই ভুল ধারনা রয়েছে যে, সম্পত্তির অভিভাবকত্বও ধারাবাহিক ক্রমানুসারে অন্য সকল পুরুষ জ্ঞাতিগনের উপর বর্তায়। সুতরাং ব্যক্তি ও সম্পত্তির অভিভাবকত্বের মধ্যে এই পার্থক্য আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে স্বরনে রাখা উচিৎ অন্যথায় নানাবিধ আইনি জটিলতার সূত্রপাত হতে পারে। 

ব্যক্তি এবং সম্পত্তি উভয়ের অভিভাবকত্ব  
এই ধরনের অভিভাবকত্ব উপরে উল্লেখিত দুই ধরনের অভিভাবকত্বের সমন্বয়ে সৃষ্টি। এই ধরনের অভিভাবক ব্যক্তি এবং সম্পত্তি উভয়ের অভিভাবকত্ব লাভ করেন। তিন ধরনরে অভিভাবকত্বের মধ্যে এই প্রকারের অভিভাবকত্ব শ্রেষ্ঠ। শুধুমাত্র পিতা এবং দাদা এই ধরনের অভিভাবকত্ব লাভ করতে পারেন। 

নাবালকের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে আমাদের সর্বদা একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে নাবালকের অভিভাবকত্ব প্রাপ্তির যে ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে (বাবা, দাদা, ভাই, চাচা) তা সকল ক্ষেত্রে আদালত মানতে বাধ্য নয়। আদালত যদি মনে করেন পিতা কিংবা দাদা অভিভাবক হিসাবে থাকলে তা নাবালকের জন্য ক্ষতির কারন হবে তাহলে আদালত পিতা কিংবা দাদার বদলে মাকে অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। সহজ কথায় বললে আদালত অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে ততক্ষন পর্যন্ত মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের বিধান অনুসরন করবেন যতক্ষন পর্যন্ত তা নাবালকের ক্ষতির কারন না হয়, যদি উক্ত বিধান প্রয়োগ করতে গিয়ে আদালত অনুভব করেন এতে নাবালক ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেক্ষেত্রে আদালত ‘নাবালকের সর্বোত্তম কল্যান নীতি’ নীতি অনুসরন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। 

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
 

আরটিভি/এসকে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission