আশুলিয়ায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ছয়জনকে হত্যার পর ভ্যানে করে নিয়ে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। ৫৯১ পৃষ্ঠার এই রায়ে আদালত অপরাধের ভয়াবহতা এবং আসামিদের সংশ্লিষ্টতার বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ স্বাক্ষরের পর রোববার (১৫ মার্চ) এ রায় প্রকাশ করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদ, আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক সহকারী এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস ও ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি উত্তর) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন।
আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসানকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়েছে। তিনি এই মামলায় অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হয়েছিলেন।
তবে এই রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছেন, অভিযুক্ত কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়ার পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশন পক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে লাশ পোড়ানোর পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ আনতে পারেনি প্রসিকিউশন। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো গুরুতর হলেও তাদের মাত্রা যথাযথভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সাজা কমেছে অনেকের। তাদের দায় এসেছে মূলত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে অপারেশন পরিচালনায় সহায়তা।
এর আগে গেল ৫ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশ করা হয়। আজ যার বিস্তারিত পাওয়া গেল।
এ মামলার আসামি মোট ১৬ জন। তাদের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন আটজন। তারা হলেন- আবদুল্লাহিল কাফী (যাবজ্জীবন), শহিদুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আরাফাত হোসেন (যাবজ্জীবন), আবদুল মালেক (মৃত্যুদণ্ড), আরাফাত উদ্দীন (৭ বছরের কারাদণ্ড), কামরুল হাসান (৭ বছরের কারাদণ্ড), শেখ আবজালুল হক (ক্ষমা) ও মুকুল চোকদার (মৃত্যুদণ্ড)।
পলাতক আট আসামি হলেন- সাইফুল ইসলাম (মৃত্যুদণ্ড), সৈয়দ নুরুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আসাদুজ্জামান রিপন (যাবজ্জীবন), এ এফ এম সায়েদ (মৃত্যুদণ্ড), মাসুদুর রহমান (যাবজ্জীবন), নির্মল কুমার দাস (যাবজ্জীবন), বিশ্বজিৎ সাহা (মৃত্যুদণ্ড) ও যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া (মৃত্যুদণ্ড)।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন আশুলিয়া থানা এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে তাদের লাশ পুড়িয়ে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত ছিলেন, তাকেও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সেদিন যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন, আস–সাবুর, তানজিল মাহমুদ, বায়েজিদ বোস্তামী ও আবুল হোসেন প্রমুখ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ থেকে এটি প্রথম রায় হলো। অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দুটি মামলার রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১। এর মধ্যে একটি মামলায় গত ১৭ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলার অন্য আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন দোষ স্বীকার করে ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গত ২৬ জানুয়ারি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১।
আরটিভি/এসআর




