নোয়াখালীর হত্যা মামলা

ফাঁসির ১২ আসামির ৮ জনই হাইকোর্টে খালাস

আরটিভি নিউজ

সোমবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২২ , ০৬:৪৭ পিএম


8 of 12 convicts hanged in High Court
ফাইল ছবি

নোয়াখালীতে এক মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী ও তার কর্মচারীকে হত্যার দায়ে বিচারিক আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির ৮ জনকে খালাস দিয়েছে হাইকোর্ট।

সাক্ষ্যপ্রমাণের যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ না করে ‘খেয়ালের বশে’ গণহারে ফাঁসির রায় দেওয়ায় উচ্চ আদালত উষ্মাও প্রকাশ করেছেন বলে জানান আইনজীবীরা।

১৪ বছর আগের ওই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির পর আজ সোমবার (৩ জানুয়ারি) বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ও বিচারপতি জাহিদ সারওয়ারের বেঞ্চ এ রায় দেন।

যারা খালাস পেলেন

ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন মোফাজ্জল হোসেন জাবেদ, জাফর হোসেন মনু, আলি আকবর সুজন, শামছুদ্দিন ভুট্টু, সাহাব উদ্দিন, নাছির উদ্দিন মঞ্জু, আবু ইউসুফ সুমন ও তোফাজ্জল হোসেন জুয়েল।

বাকি ৪ আসামির মধ্যে আবদুস সবুরের ফাঁসির দণ্ড পাল্টে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যাদের ফাঁসির দণ্ড বহাল

কামরুল হাসান সোহাগ, রাশেদ ড্রাইভার ও কামাল হোসেন ওরফে এলজি কামালের ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখেছে আদালত। এরা সবাই পলাতক।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ হাই কোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শাহীন আহমেদ খান।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বিচারিক আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জোরাল সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকা সত্বেও সেগুলো আমলে না নিয়ে হাই কোর্ট ৮ আসামিকে খালাস দিয়েছেন। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সংক্ষুব্ধ, আমরা আপিল করব।’

সেদিন যা ঘটেছিল

২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে শহরের ‘মোবাইল ফেয়ারের’ মালিক ফিরোজ কবির মিরণ ও তার দোকানের কর্মচারী সুমন পাল নগদ ১৩ লাখ টাকা ও কিছু মোবাইল ফোন সেট নিয়ে রিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন।

পথে নাপিতের পুল এলাকায় সন্ত্রাসীরা তাদের দুই জনকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। পরে টাকা ও মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে তাদেরকে কুপিয়ে খুন করে মরদেহ সড়কের পাশে ফেলে যায়।

এই ঘটনার পরদিন নিহত মিরনের বাবা এবি সিদ্দিক বাবুল মিয়া বাদী হয়ে ২৩ জনকে আসামি করে সুধারাম মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

বন্দুকযুদ্ধে জিসান নিহত

সেই মামলায় ১০ জনকে খালাস দিয়ে ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ এ এন এম মোরশেদ খান ১২ জনের ফাঁসির রায় দেন। সোলাইমান জিসান নামে এক আসামি আগেই র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।

যা বললেন আইনজীবী

রায় ঘোষণার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিল বিবেচনায় নিয়ে আদালত ৮ জনকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ থেকে মুক্তি দান করেন এবং অনতিবিলম্বে তাদেরকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য ৩ জন আসামির ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার বিষয়ে তাদের স্বীকারোক্তি বিবেচনায় নিয়ে তাদের ফাঁসির দণ্ডাদেশ হাই কোর্ট বিভাগ বহাল রেখেছেন।’

আব্দুস সবুরের সাজা কমানোর বিষয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে মামলা প্রমাণিত হয়েছে মর্মে আদালত তাকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ কমিউট করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন।’

‘খেয়ালের বশে’ রায়, আদালতের উষ্মা

সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথ বিচার বিশ্লেষণ না করে ‘খেয়ালের বশে’ বিচারিক আদালতে অধিক সংখ্যায় ফাঁসির রায় ঘোষণার বিষয়ে উচ্চ আদালত উষ্মা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজহার উল্লাহ ভুঁইয়া বলেন, “এ বিষয়ে হাই কোর্ট রায় ঘোষণার সময় উষ্মা প্রকাশ করেছেন যে, আইন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথ বিবেচনায় না নিয়ে ‘হুইমের’ ওপর ভিত্তি করে এই রায় প্রদান করা হয়েছে, যেটা উচিত নয়। আরও সতর্কভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ পরীক্ষা করা এবং আইনকে যথাযথভাবে বিবেচনায় রেখে এই ধরনের মামলাগুলি নিষ্পত্তি করার জন্য উচ্চ আদালত তাগিদ দিয়েছেন।”

আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘ট্রায়াল কোর্ট ফাঁসির দণ্ড দিতে বেশি ভালোবাসেন। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচারবিশ্লেষণ না করে এই যে গণহারে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হচ্ছে, হাই কোর্টের অদ্যকার রায়ের মাধ্যমে এটাই প্রতিফলিত হয়েছে, ফাঁসি দিলে হাইকোর্ট ডিভিশন ও আপিল বিভাগে টিকবে না। এ জন্য সময় এসেছে বিচারালয়ে যারা আছেন, বিচার কাজের সাথে সম্পৃক্ত এখন দেখেশুনে, সাক্ষ্যপ্রমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাক্ষীসাবুদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রায় প্রদানের সময় এসেছে বলে আমি মনে করি।’

আপিলে এসে বেশি সংখ্যায় খালাস হয়ে গেলে প্রকৃত অপরাধীদেরও ছাড়া পাওয়ার সুযোগ থেকে যাচ্ছে কি-না, এমন প্রশ্নে আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আমি যতগুলো মামলা করেছি, সেই নিরিখে আমি আপনাদেরকে বলতে চাই, আমরাতো মামলার যে সাক্ষ্যপ্রমাণ সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করি, মহামান্য আদালতের নিকট পেশ করি, এতে করে আমার মনে হয় না কোনো অপরাধী ছাড়া পায়। আসলে কোনো অপরাধী ছাড়া পায় না, বরং নিরপরাধ যাদেরকে আসলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো না কোনোভাবে টেনে আনা হয়েছে এখানে মামলায়, সে সমস্ত আসামিরাই খালাস পেয়ে যায়। খালাস পাওয়া তাদের অধিকার, এ কারণে তারা খালাস পায়।’

কেএফ

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission