বাংলাদেশে সকল ধর্মীয় উৎসব যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে—এমন মত প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতা, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপনই হতে পারে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সহাবস্থানের মূল ভিত্তি।
মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ফাইন্যান্স (বিআইআইএফ) কনফারেন্স হলে ‘ধর্মীয় উৎসব ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব অভিমত ব্যক্ত করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মাল্টিফেইথ নেইবার্স নেটওয়ার্ক (এমএফএনএন)-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (বিআইআইটি) এ আয়োজন করে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিআইআইটি’র মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবদুল আজিজ। বক্তব্য রাখেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম শায়খ মোহাম্মাদ মহিবুল্লাহিল বাকী।
তিনি বলেন, ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।’ এ আয়াতই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল শিক্ষা দেয়। উৎসবকে রাজনৈতিক না করে সম্প্রীতির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব ড. গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, দুর্গোৎসব হোক বা ঈদ—আমাদের উৎসবে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে আমরা কতটা আন্তরিকভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত আছি। এই ঐতিহ্য আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশের বেশিরভাগ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে ব্যক্তি স্বার্থ ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে হলে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সহনশীল বক্তব্য রাখতে হবে এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী কথাবার্তা এড়িয়ে চলতে হবে।
বাংলাদেশ বৌদ্ধ ফেডারেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ভদন্ত বোদ্ধানন্দ মহাথেরো বলেন, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—আমরা সবাই মানুষ। সবার প্রতি সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি এডভোকেট দ্বীনবন্ধু রায় বলেন, আমাদের দায়িত্ব হলো সম্প্রীতির বন্ধনকে রক্ষা করা। প্রত্যেক ধর্মের মূল শিক্ষা শান্তি ও সম্প্রীতি হলেও আমরা তা অনুসরণ করি না। যতদিন আমরা অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবো না, ততদিন সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এম আবদুল আজিজ বলেন, বাংলাদেশের মাটি বরাবরই বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনের স্থান। আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়ালে সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা যৌথভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলে সম্প্রীতি ও সহাবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন— জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম, লেখক ও গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্রাহ্মণ সংসদের মহাসচিব বিজয় কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, ড. জাকির হোসেন সেলিম, সজীব কুণ্ড তপু এবং এডভোকেট প্রদীপ কুমার পাল।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জাহিদুর রহমান। সভায় বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আরটিভি/এমকে




