৩৪তম আন্তর্জাতিক ও ২৭তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁও বেঙ্গল স্কয়ারে ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আয়োজিত ‘প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন ইন্সপিরেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা মুনিরা ইসলাম।
বৈঠকের মিডিয়া পার্টনার ছিলো জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভি ও দৈনিক কালবেলা। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য— ‘প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ি, সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করি’।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন— জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সচিব ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী, জাতীয় শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক ড. মো. রেজাউল কবির, বিএনপির সহশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান, এনসিপি কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আব্দুল আহাদ, গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি রাশেদ রাব্বি, দৃষ্টিজয়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অভিভাবক সাবির সুলতানা এবং সেরিব্রাল পলিসি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একজন উদ্যোক্তা শর্মী রায়।

ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী: জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তুলনামূলকভাবে একটা নতুন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধী মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলতে সারাদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে। আমরা প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য কাজ করছি। এরই মধ্যে প্রতিবন্ধী ও সমাজে পিছিয়ে পড়া ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়নে দেশজুড়ে বিভিন্ন কাজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী মানুষ সাধারণত ইশারা ভাষায় কথা বলে। এই ভাষা যেন অন্য মানুষের জন্যও বোধগম্য হয় তাই আমরা ইশারা-ভাষা নিয়েও কাজ শুরু করব। প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন সরকারের পক্ষে একা সম্ভব নয়। এজন্য বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে এগিয়ে আসতে হবে।

রেজাউদ্দিন স্টালিন: শিল্পকলা একাডেমি প্রতিবন্ধী মানুষের দক্ষতা উন্নয়নে সারাদেশে প্রশিক্ষণ কর্মশালা চালু রেখেছে। যেখানে আগ্রহের সঙ্গে এসব মানুষ গান, আবৃতিসহ নানা ধরনের দক্ষতা অর্জন করছেন। শিল্পকলা একাডেমিতে আমরা কাউকে আলাদা করে দেখি না। প্রতিবন্ধী মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে শুধু রাষ্ট্র নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে। আমরা চাই সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ এগিয়ে আসবে এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে। এই মানুষগুলোকে যদি অন্তর্ভুক্ত না করা হয় তাহলে সমাজ পিছিয়ে যাবে, শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে হোক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হোক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে। প্রত্যেকটি সেক্টরে কিন্তু এদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত তার সামর্থ্য অনুযায়ী। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া কোনো কিছুর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় না।

ড. মো. রেজাউল কবির: দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার রয়েছে সরকারি সুযোগ পাওয়ার। আমরা বিভিন্ন ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বলে আসছি সাধারণ সিঁড়ির পাশাপাশি যেন হুইলচেয়ারের র্যাম্পও তৈরি করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে হুইলচেয়ারের র্যাম্প তৈরিও করছে। প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচিও আমরা বাস্তবায়ন করছি। চলতি বছরে প্রায় ৭০ হাজার হুইলচেয়ার বিতরণ করা হয়েছে। সারাদেশের ৬৪ জেলা ও ৩৯ উপজেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সেবা নিয়ে থাকে। আমরা সবসময় প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যেই আরও ২০টি সেন্টার সম্প্রসারণের জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেলে আমরা আরও ২০টি সেন্টারে কার্যক্রম চালু করব। আশা করছি এই চলতি অর্থবছরের মধ্যে কার্যক্রম শুরু হবে।

হেলেন জেরিন খান: প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে দল-মত নির্বিশেষে একসঙ্গে কাজ করা দরকার। এজন্য প্রথমেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নয়তো ইনক্লুসিভ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। এ কাজে সরকারকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া সবার সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালানো দরকার। সেটা হচ্ছে রাজনীতিবিদ অবশ্যই কারণ রাজনীতিবিদরা লিডিং পয়েন্টে থাকে, দ্বিতীয় হচ্ছে প্রশাসনের সহযোগিতা আর তৃতীয় হচ্ছে মিডিয়া। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে এই তিনটা জায়গা থেকে সমানভাবে কাজ না করি তাহলে কিন্তু আমাদের এই যে পিছিয়ে পড়া যে প্রজন্ম তাদেরকে সামনে নিয়ে আসতে পারবো না। আগামী প্রজন্ম আমরা কীভাবে গড়ে তুলতে চাই, সে বিষয়ে এখনই ভাবতে হবে। আমরা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, সুরক্ষা নিয়ে গুরুত্বসহকারে কাজ করব।

ডা. আব্দুল আহাদ: অটিজম কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন রোগের চিকিৎসায় নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড জেনেটিক্স ডিজিজেস নিয়ে দেশে সরকারি কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেই। আমরা দাবিও তুলেছি নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড জেনেটিক্স ডিজিজেস বা অটিজম নিয়ে আলাদা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল জরুরি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ছোটবেলা থেকে মনিটরিং করতে হবে। কারণ ছোটবেলায় তাদের অনেক উপসর্গ দেখা যায়। তখন দ্রুত চিকিৎসা ও যত্নে শিশুরা রোগটি থেকে সেরে উঠতে পারে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও সুরক্ষায় জোর দিতে হবে।

আবুল হাসান রুবেল: প্রতিবন্ধকতা ইস্যুতে অগ্রাধিকারে নিয়ে যেতে হবে। দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নেই। এই যে সারা দেশের সড়ক পারাপারের জন্য ওপর ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়, সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষ কীভাবে রাস্তা পারাপার হবে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এসব বাধার সম্মুখীন। সব সরকারি-বেসরকারি অফিসে প্রবেশ ক্ষেত্রের এসব অভিগম্যতায় বৈষম্য দূর করতে হবে। দীর্ঘদিনের পুরোনো ব্যবস্থাপনা ভেঙে সর্বজনীন নতুন বন্দোবস্ত গড়ে তুলতে হবে।

রাশেদ রাব্বি: বাংলাদেশে এই প্রতিবন্ধী বিষয়টা একটা মৌসুমি ইস্যু। এটাকে সরকার কখনোই গুরুত্ব সহকারে দেখেনি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমস্যাকে কেউ নিজের সমস্যা মনে করে ভাবেনি। অথচ এসব মানুষের সমস্যাকে যদি তাদের মতো করে ভাবা হতো তাহলে দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন সহজ হতো। দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে পৃথক ব্যবস্থা নেই। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসাসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা খাতে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে গবেষণা জরুরি। সকল ক্ষেত্রে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন এবং স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে পৃথক ডেস্ক চালু করা প্রয়োজন।

অ্যাড. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যাপিত জীবন মোটেও সহজ নয়। সেখানে লেখাপড়া অনেকটা যুদ্ধের মতো। সব স্কুলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পড়াশোনার সুযোগ নেই। সমাজে কিংবা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে প্রতিবন্ধীদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা কিংবা হেয়প্রতিপন্নের মনোভাব রয়েছে। নিকটাত্মীয় এবং পরিবারের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আবার এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার সময় শ্রুতি লেখকের বোর্ডের অনুমোদন পেতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাঙ্ক্ষিত প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে তারা আর সমাজের বোঝা হবে না। জাতীয় অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে।

সাবির সুলতানা: ১৯ বছরের আমার এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু আছে, যার কানে শোনার ক্ষেত্রে সামান্য সমস্যা আছে। তবে আমি তাকে সার্বক্ষণিকভাবে সময় দিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে আমার ছেলে তবলা বাজাতে পারে। রান্না করা শিখেছে। আবার ভালো ছবিও আঁকতে পারে। তবে পড়াশোনা করতে দিয়ে নানা বিপত্তিতে পড়েছি। আমরা চেয়েছিলাম সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি সর্বজনীন পরিবেশে সে বেড়ে উঠুক। কিন্তু বাস্তবতা খুবই ভিন্ন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পড়াশোনার মতো স্কুল নেই, শিক্ষকদের আচরণগতও গ্রুমিং কিংবা প্রশিক্ষণও নেই। এমন একটি অবকাঠামো চাই যাতে, আমরা মরে গেলেও আমাদের সন্তানরা যেন নিরাপদে থাকতে পারে।

শর্মী রায়: ছোটবেলায় সেরিব্রাল পলিসি রোগাক্রান্ত হই। এরপর সাভার সিআরপি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করি। সিআরপি কর্তৃপক্ষ বলেছিল এখন সাধারণ স্কুলে ভর্তি হতে। কিন্তু সাধারণ স্কুলে আর আমাকে ভর্তি নেয়নি। তবে আমি থেমে যাইনি। গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে একটি প্রতিষ্ঠানে ১২ বছর কাজ করেছি। কভিডে চাকরি হারানোর পর হোমমেড ফুডের বিজনেস শুরু করেছি। সবাই আমার ফুড প্রসেসিং ঘুরে দেখে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। কিন্তু তাদের অফিসে গিয়ে দেখি, সেখানে আমাদের মতো মানুষে প্রবেশের সুযোগ নেই। হুইলচেয়ার নিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ। হুইলচেয়ার নিয়ে যাতে প্রবেশ করা যায় এই ব্যবস্থা স্কুল, কলেজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং সরকারি প্রতিটি দপ্তরে থাকা জরুরি। এ ছাড়া আমরা যারা প্রতিবন্ধী মানুষেরা আজকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি যতটুকুই এগিয়েছি তার সবটুকুই অভিভাবক এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের মনের জোরের দ্বারা আমরা এগিয়েছি। এবং কিছু মানুষ যারা নিঃস্বার্থভাবে আসে তারা সহযোগিতা করে।
আরটিভি/একে





