ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলি করা হয়। মেডিকেল বোর্ডের সবশেষ তথ্যমতে, হাদির কিডনির কার্যক্ষমতা ফিরে এলেও সার্বিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বর্তমানে তাকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখা হয়েছে।
এদিকে, ওসমান হাদিকে গুলি করা অভিযুক্তদের এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাদের ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে সরকার। একইসঙ্গে দুষ্কৃতিকারীদের পরিচয়সহ পুরো ঘটনার পূর্বাপর সম্ভাব্য সব তথ্যই যাচাই করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হাদির সঙ্গে থাকা দুই যুবককের মধ্যে সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তার নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ ওরফে রাহুল। তিনি রাজধানীর আদাবর থানা ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে পুরোনো খবর থেকে জানা গেছে।
ফয়সালের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে; উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। তার বাবার নাম মো. হুমায়ুন কবির ওরফে আবদুল মালেক মুন্সি।
এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, ফয়সালের পৈত্রিক বাড়ি বাউফলে হলেও অনেক বছর ধরে তাকে এলাকায় দেখা যায়নি। এমনকি তার বাবা কিংবা পরিবার কাউকে এলাকা দেখা যেত না। ফয়সাল করিম কোনোদিন গ্রামের বাড়িতে আসেননি। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা ঢাকায় থাকেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ২৮ অক্টোবর রাজধারীতে একটি অফিসে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুট করা হয়। এ ঘটনায় আদাবর থানায় করা মামলায় অভিযুক্ত ফয়সাল করিমকে প্রধান আসামি করা হয়। ৭ নভেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মোবাইল ফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে জামিনে বের হন তিনি।
পুলিশের পিসিআর (PCR) রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ফয়সাল করিম ঢাকার আদাবর থানাধীন পিস কালচার হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করতেন।
অন্যদিকে, ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনার পর যশোরের বেনাপোল সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সংস্থাটি জানায়, হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যাতে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে লক্ষ্যে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সীমান্তজুড়ে নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, হাদিকে গুলির ঘটনায় অভিযুক্তদের শনাক্তের পর তাদের গ্রেপ্তার করতে অন্তত পাঁচ জায়গায় অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে, সন্ত্রাসীরা বারবার অবস্থান বদলে ফেলা ও সিমকার্ড পরিবর্তন করায় গ্রেপ্তারে বেগ পেতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, গুলিবিদ্ধ হাদির পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে। মামলায় মোটরসাইকেল চালক ও তার পেছনে বসে যিনি গুলি করেছে তাদেরকে আসামি করা হবে।
এর আগে, দুপুরে নির্বাচনী প্রাচারণা চালানোর সময় রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজ শেষে মতিঝিল দিক থেকে একটি কালো মোটরসাইকেলে করে দুজন ব্যক্তি আসে। মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ব্যক্তি ক্লোজ রেঞ্জ (খুব কাছ) থেকে হাদির মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হামলার পরপরই মোটরসাইকেলটি দ্রুতগতিতে এলাকা ত্যাগ করে। এরপর হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে আনা হয়েছে। সেখানে থেকে গুরুতর অবস্থায় তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ও ব্যাপক তদন্ত চালিয়ে হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়া বিএনপি-জামায়তসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি হাদির ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত নভেম্বর মাসে দেশি-বিদেশি ৩০টি নম্বর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পেয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন হাদি। ১৪ নভেম্বর ফেসবুকে একটি পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে হত্যা, তার বাড়িতে আগুনসহ তার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ওসমান হাদি লিখেছিলেন, গত তিন ঘণ্টায় আমার নম্বরে আওয়ামী লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টা বিদেশি নম্বর থেকে কল ও টেক্সট করেছে। যার সামারি হলো- আমাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে।
আরটিভি/আরএ





