ইচ্ছে করেই বাংলা ভাষার বিকৃতি করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর।
তিনি বলেন, চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর নতুন করে কিছু প্রশ্ন সামনে আসতে শুরু করেছে। কেউ কেউ মুখের ভাষায় ‘ন্যায়বিচার’ শব্দের বদলে ‘ইনসাফ’, ‘ব্যবস্থা’র বদলে ‘বন্দোবস্ত’, ‘মীমাংসা’র বদলে ‘ফয়সালা’ ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করেছেন।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসার ও সংকট ঘিরে একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, এ রকম প্রয়োগ ভাষার চেহারা বদলে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বাংলা ভাষার ‘নিজস্ব’ শব্দ থাকতে এ রকম আরোপণ বা সংযোজন কেন? এ নিয়ে নানা আলোচনা–সমালোচনা দেখা গেছে। আরেকটা প্রশ্ন বেশ পুরোনো, জেন-জি সেটা নতুন করে উসকে দিয়েছে। এই প্রজন্ম মুখের কথায় প্রমিত ভাষা ব্যবহার করে না। আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কথা বলার সময়েও তারা সেটা করে না অথবা পারে না। এই সচেতন বা অসচেতন প্রয়াস কি বাংলা ভাষার ‘বিকৃতি’ ত্বরান্বিত করছে? সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
তারিক মনজুর বলেন, এসব প্রশ্ন আর দীর্ঘশ্বাসের জবাব খুঁজতে পাকিস্তান পর্বে যাওয়া যাক। পূর্ব বাংলার সরকার ১৯৪৯ সালে বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে ‘ইস্ট বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটি প্রস্তাব করেছিল, নবগঠিত ‘মুসলিম’ রাষ্ট্রে জন্ম-জন্মান্তর শব্দের বদলে কিয়ামত, ঋণ শব্দের বদলে কর্জ, বিস্ময়ের বদলে তাজ্জব—এ রকম ‘মুসলমানি’ শব্দ ব্যবহার করতে হবে। ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হলে মুনীর চৌধুরী আপত্তি তুলে বলেন, ‘যারা ভাষাতত্ত্বে অনভিজ্ঞ, ব্যাকরণের মর্মোদ্ধারে অনভ্যস্ত, অভিধানে অনাস্থাবাদী’, তারাই এ রকম সংস্কারের সুপারিশ করেছেন। হুমায়ুন আজাদ পরে একে ‘বাঙালি জাতিসত্তাকে পর্যুদস্ত করার চক্রান্ত’ হিসেবে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, যেকোনো ভাষায় একই ধরনের অর্থ প্রকাশক একাধিক শব্দ থাকে। যেমন বাংলা ভাষায় মীমাংসা, নিষ্পত্তি, ফয়সালা বা মিটমাটের অর্থ প্রায় একই। কিংবা এই ভাষায় ‘ন্যায়বিচার’, ‘ইনসাফ’, ‘জাস্টিস’ প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার যে ‘বন্দোবস্ত’ শব্দটি এখন নতুন অভিপ্রায়ে ব্যবহার শুরু হয়েছে, তার প্রয়োগ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ও আগে থেকে ছিল। নতুন করে শব্দ ব্যবহারের এই ধরন যতটা না ভাষার ব্যাপার, তার চেয়ে বেশি জাতিগত স্বাতন্ত্র্য কিংবা রাজনৈতিক ভেদের ব্যাপার। এটা ভাষিক বিকৃতি নয়—এটা নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা করারও কিছু নেই। তবে এ ধরনের কৃত্রিম ও আরোপিত উদ্যোগ ভাষার মূল কাঠামো মেনে নেয় না; কেননা তা স্বতঃস্ফূর্ত নয় এবং ভাষা ব্যবহারকারীর বড় অংশ এর বাইরেই থেকে যায়।
অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, নতুন শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা অনেক সময় ভাষার চেয়ে বেশি জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এটি ভাষিক বিকৃতি নয়। এ নিয়ে অযথা আতঙ্কের কারণও নেই। তবে কৃত্রিম ও আরোপিত উদ্যোগ ভাষার স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, ভাষা শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীর সম্মিলিত চর্চায় টিকে থাকে।
সবশেষে তিনি বলেন, বিশ্বের বড় ভাষাগুলোও ইংরেজির প্রভাব অস্বীকার করতে পারেনি। ইংরেজিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে লাভ নেই; প্রয়োজন বাংলাকে প্রযুক্তিসক্ষম করা।
আরটিভি/এমএ





