দেশত্যাগের পর থেকেই দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ মিলছে সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে। এবার বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) বিতর্কিত এক প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে তার।
বিটিসিএলের সক্ষমতা বাড়াতে ‘ফাইভজি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। প্রায় ২৮ লাখ টাকা খরচ করে বুয়েটের মাধ্যমে প্রথমে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি বা সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করা হয়।
বুয়েটের ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী দল দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলার বিদ্যমান ব্যান্ডউইথ ব্যবহার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ব্যান্ডউইথ ইত্যাদি বিবেচনা করে একটি সূত্রের মাধ্যমে ২০৩০ সালে বিটিসিএলের ব্যান্ডউইথ চাহিদা ২৬ দশমিক ২ টেরাবাইট নির্ধারণ করে। এই ব্যান্ডউইথ সরবরাহের জন্য বুয়েট ১০০জি লাইন কার্ড স্থাপনের সুপারিশ করে। বুয়েট এ সমীক্ষাটি চালায় করোনার প্রাদুর্ভাবকালে। সে সময়ে দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার ছিল সর্বোচ্চ। তবে, বুয়েটের প্রতিবেদন উপেক্ষা করে সুকৌশলে ২৬ টেরাবাইটের পরিবর্তে ১২৬ টেরাবাইটের যন্ত্রপাতি কেনার ফন্দি আঁটেন তৎকালীন সরকারের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। ২৬ টিবিপিএসে সর্বোচ্চ ১৫ মিলিয়ন ডলার (দরপত্র আহ্বানের সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকা হিসাবে ১৬৫ কোটি টাকা) খরচে যে কাজ করা সম্ভব ছিল, সেটা করতে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৩২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনার আয়োজন চূড়ান্ত করা হয়।
এ অবস্থায় প্রকল্পটি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর দুদক প্রকাশ্য অনুসন্ধানে নামলে স্থবির হয়ে পড়ে প্রকল্পের কার্যক্রম। অনুসন্ধানে পদে পদে অনিয়মের প্রমাণ পায় দুদক। প্রকল্পের গোপনীয়তার শর্ত লঙ্ঘন, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় করে সরকারি বিপুল অর্থের অপচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, পিপিআর লঙ্ঘন, মানহীন যন্ত্রপাতি ক্রয়, বুয়েটের প্রস্তাবের চেয়ে চার গুণ বেশি যন্ত্রাংশ ক্রয়চেষ্টার সত্যতা পায় সংস্থাটি। অভিযোগটি এখনও দুর্নীতি দমন কমিশনে অনুসন্ধানাধীন।
এদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পালাবদলে তথ্য ও যোগাযোগ উপদেষ্টা হন বর্তমান এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে তার দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে ও যন্ত্রাংশ ক্রয়ের উদ্দেশ্যে চায়নায় ফ্যাক্টরি ভিজিটে যেতে তিন কর্মকর্তার অনুকূলে জিও জারি করা হয়। তবে, দুর্নীতির বিষয়টি জানতে পেরে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নাহিদ সেই জিও বাতিল করান। একইসঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগটি তদন্তের উদ্যোগ নেন তিনি। তবে, নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দায়িত্ব নিয়ে আবার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠেন। প্রকল্পের সরঞ্জাম আমদানি করতে শুরু হয় তোড়জোড়। প্রথমে গত বছরের ১৩ এপ্রিল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে দুদকে চিঠি দিয়ে প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। এছাড়া, ১৬ এপ্রিল ফের বিটিসিএল থেকে ফ্যাক্টরি ভিজিটে চায়না যাওয়ার অনুমতি চেয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়। তবে, প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি না দিয়ে আবেদনটি ফেরত পাঠানো হয়। এ পরিস্থিতিতে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তার ব্যক্তিগত সহকারীকে নিয়ে নিজেই যান চীনে। গত ৪ মে জারি করা জিও থেকে জানা যায়, চীন ভ্রমণের সব ব্যয় বহন করে চায়না এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ (সিইএবি)।
জানা যায়, সিইএবি বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা ৩০০টিরও বেশি বড় চীনা কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে হুয়াওয়ে টেকনোলজিস। আর বিটিসিএলে ফাইভজি প্রকল্পে যন্ত্রাংশ সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছে এই হুয়াওয়ে টেকনোলজিস।
গত ১৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাব দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের তৎকালীন সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘এ প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ার অবশিষ্ট কার্যক্রম এগিয়ে বা চালিয়ে নিলে তা আইনের ব্যত্যয় হবে বলে প্রতীয়মান হয় এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ ব্যয় আইনসিদ্ধ হবে না বলে অনুমেয়।’
দুদকের এই মতামত পাওয়ার পর চীন থেকে ফিরেই বেপরোয়া হয়ে পরেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। ২২ জুন তার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্যাডে একটি আধাসরকারি পত্র দেন দুদক চেয়ারম্যানকে। প্রকল্পের সুফল ও গুরুত্ব তুলে ধরে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ফাইভজির উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রাখা একান্ত প্রয়োজন। এরপর এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত মনোযোগ ও আন্তরিক সহযোগিতা চান তিনি।
দুদক চেয়ারম্যান সেই চিঠির কি জবাব দিয়েছেন বা আদৌ দিয়েছেন কি না বা চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি। তবে, দুদকের অনুসন্ধানে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যায়।
এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ বলেন, অভিযোগটি ঘিরে অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানে এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করবেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। প্রতিবেদনের আলোকে কমিশনের অনুমোদনক্রমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ১৮ ও ১৯ মে বিটিসিএলের ফাইভজি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালককে চিঠি দিয়ে যন্ত্রাংশ পাঠানোর কথা বলে হুয়াওয়ে। কোনো কিছুতেই যখন কোনো বৈধ অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয় বিটিসিএলের এমডিকে। ২৫ মে উপসচিব মৌরান করিম স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে নিজের ইচ্ছামতো কিছু নির্দেশনা দিয়ে ফয়েজ তৈয়্যব ওই প্রকল্পের মালপত্র শিপমেন্ট করার অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে বিটিসিএলের মধ্যকার সেই চিঠি প্রকল্প পরিচালক এনডোর্স করে হুবহু পাঠিয়ে দেন হুয়াওকে। হুয়াওয়েও নির্দেশ পেয়ে মালপত্র শিপমেন্ট করে।
জানা গেছে, এখন সেই প্রকল্পে এলসির প্রায় ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য ব্যাংক ম্যানেজারকে নানাদিক থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। চীনের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সুইফটে টাকা চাওয়া অব্যাহত আছে। অন্যদিকে, হুয়াওয়ে বাংলাদেশ ও হুয়াওয়ের পক্ষে নিয়োগকৃত বাংলাদেশি বিভিন্ন লবিস্ট নিয়মিত ব্যাংক ম্যানেজারকে টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছে। অনুসন্ধান চলমান থাকায় ব্যাংক ম্যানেজার টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। উপায়ান্তর না পেয়ে ব্যাংক ম্যানেজার বেশ কয়েকবার দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন। অনুসন্ধান শেষ হলেও দুদকের প্রতিবেদন কোনো এক অদৃশ্য কারণে আটকে আছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সঙ্গে। একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি। এরপর প্রশ্ন লিখে মেসেজ পাঠালে তিনি “বিটিসিএল কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘ফাইভজি’র উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন” শীর্ষক প্রকল্পের প্যাকেজ নং-GD-01 এর আওতায় আমদানীকৃত যন্ত্রপাতির গুণগতমান নিশ্চিতকল্পে গঠিত সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট টিমের প্রতিবেদন শীর্ষক একটি রিপোর্ট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান।’ এরপর লেখেন, ‘এ ধরনের চাপ দেওয়ার কোনো বিষয় নেই। বরং বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্ট নিয়ে কমিটি করে ইন্টেনসিভ টেস্টিং করা হয়েছে। এখানে রিপোর্ট আছে। মন্ত্রণালয় থেকে এর বাইরে কোনো কিছু করা হয়নি।’
আরটিভি/এসএইচএম





